HomeBusiness Guidelinesব্যবসায় লাভ হচ্ছে, তবুও টাকার সংকট কেন? সম্ভাব্য কারণ ও সমাধান

ব্যবসায় লাভ হচ্ছে, তবুও টাকার সংকট কেন? সম্ভাব্য কারণ ও সমাধান

একজন ব্যবসায়ী সারা মাস পণ্য বিক্রি করলেন ২০ লাখ টাকার। পণ্য কেনা, দোকান ভাড়া, কর্মচারীদের বেতন, পরিবহন ও অন্যান্য খরচ বাদ দেওয়ার পর হিসাবের খাতায় ২ লাখ টাকা লাভও দেখা যাচ্ছে। কিন্তু মাস শেষে সরবরাহকারীর বিল পরিশোধ, কর্মচারীদের বেতন দেওয়া কিংবা নতুন পণ্য কেনার সময় দেখা গেল, ব্যবসার হাতে পর্যাপ্ত টাকা নেই।

এমন পরিস্থিতিতে ব্যবসায়ীর মনে স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন আসে যে ব্যবসায় লাভ হচ্ছে, বিক্রয়ও বাড়ছে, তাহলে টাকা যাচ্ছে কোথায়?

বাংলাদেশের অনেক পাইকারি, খুচরা ও উৎপাদনকারী ব্যবসায় এই সমস্যা দেখা যায়। বিশেষ করে যেসব ব্যবসায় বাকিতে পণ্য বিক্রি করা হয়, বেশি পরিমাণে মজুত রাখতে হয় কিংবা ক্রেতার কাছ থেকে টাকা পেতে দীর্ঘ সময় লাগে, সেখানে নগদ অর্থের সংকট তৈরি হতে পারে।

এর মূল কারণ হলো, ব্যবসার লাভ এবং ব্যবসার হাতে থাকা নগদ টাকা এক বিষয় নয়।

একটি ব্যবসা হিসাব অনুযায়ী লাভ করতে পারে, কিন্তু সেই লাভের অর্থ ক্রেতার কাছে পাওনা, পণ্যের মজুত কিংবা অন্য কোনো সম্পদে আটকে থাকতে পারে। আবার ঋণের মূল টাকা পরিশোধ, নতুন যন্ত্রপাতি কেনা বা মালিকের ব্যক্তিগত উত্তোলনের কারণেও ব্যবসার নগদ অর্থ কমে যেতে পারে।

এই আর্টিকেলে আমরা জানব, ব্যবসায় লাভ থাকা সত্ত্বেও টাকার সংকট কেন তৈরি হয়, কীভাবে সমস্যাটি শনাক্ত করতে হয় এবং কীভাবে Working Capital ও Cash Flow ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে এই সংকট কমানো যায়।

লাভ ও নগদ অর্থের মধ্যে পার্থক্য কী?

প্রথমে বুঝতে হবে, Profit বা লাভ এবং Cash Flow বা নগদ প্রবাহের মধ্যে পার্থক্য কোথায়।

Profit বা লাভ হলো নির্দিষ্ট সময়ের আয় থেকে সংশ্লিষ্ট ব্যয় বাদ দেওয়ার পর যে পরিমাণ অর্থ থাকে।

অন্যদিকে, Cash Flow হলো নির্দিষ্ট সময়ে ব্যবসায় নগদ অর্থের আগমন ও বহির্গমন।

ধরা যাক, একটি ব্যবসা ৫ লাখ টাকার পণ্য বাকিতে বিক্রি করল। পণ্যগুলোর ক্রয়মূল্য ছিল ৪ লাখ টাকা।

হিসাব অনুযায়ী:

বিবরণ টাকা
বিক্রয় ৫,০০,০০০
বিক্রিত পণ্যের ক্রয়মূল্য ৪,০০,০০০
মোট লাভ ১,০০,০০০

ব্যবসাটি ১ লাখ টাকা মোট লাভ করেছে।

কিন্তু ক্রেতা যদি এখনো টাকা পরিশোধ না করে, তাহলে ব্যবসার হাতে এই বিক্রয়ের বিপরীতে নগদ অর্থ আসেনি। অর্থাৎ, বিক্রয় ও লাভ হিসাবের মধ্যে স্বীকৃত হলেও নগদ টাকা এখনো আদায় হয়নি।

এই কারণেই ব্যবসার আর্থিক অবস্থা বুঝতে শুধু Income Statement দেখলে চলবে না। Balance Sheet, Cash Flow Statement এবং পাওনা আদায়ের অবস্থাও বিশ্লেষণ করতে হবে।

বাকিতে বিক্রয় বেশি হলে নগদ অর্থের সংকট তৈরি হয়

ব্যবসায় বিক্রয় বাড়ানোর জন্য অনেক উদ্যোক্তা ক্রেতাদের বাকিতে পণ্য সরবরাহ করেন। এতে বিক্রয় বাড়তে পারে, নতুন ক্রেতা পাওয়া যায় এবং বাজারে ব্যবসার অবস্থান উন্নত হতে পারে। কিন্তু বাকিতে বিক্রয়ের একটি বড় ঝুঁকি হলো, পণ্য সরবরাহ করার পরও ব্যবসাকে টাকা পাওয়ার জন্য অপেক্ষা করতে হয়।

ধরা যাক, একটি পাইকারি ব্যবসা মাসে ১৫ লাখ টাকার পণ্য বিক্রি করে।

এর মধ্যে:

  • নগদ বিক্রয়: ৫ লাখ টাকা
  • বাকিতে বিক্রয়: ১০ লাখ টাকা

ব্যবসাটির পণ্য কেনা, পরিবহন ও অন্যান্য খরচ নিয়মিত পরিশোধ করতে হচ্ছে। কিন্তু ক্রেতাদের কাছ থেকে ১০ লাখ টাকা আদায় হতে যদি ৩০ থেকে ৬০ দিন সময় লাগে, তাহলে ব্যবসাকে এই সময়ের খরচ নিজের অর্থ বা ঋণ দিয়ে বহন করতে হবে।

এখানে সমস্যা হলো, বিক্রয় হয়েছে, কিন্তু বিক্রয়ের টাকা এখনো হাতে আসেনি।

কীভাবে সমাধান করবেন?

  • ক্রেতাদের জন্য নির্দিষ্ট Credit Period নির্ধারণ করুন।
  • কে কত টাকা বাকিতে নিতে পারবে, তার সীমা ঠিক করুন।
  • নির্ধারিত সময়ের মধ্যে টাকা আদায়ের ব্যবস্থা করুন।
  • দীর্ঘদিনের বকেয়া পাওনা নিয়মিত পর্যালোচনা করুন।
  • নতুন করে বাকিতে পণ্য দেওয়ার আগে পুরোনো পাওনার অবস্থা যাচাই করুন।

শুধু বিক্রয়ের পরিমাণ বাড়ানোর দিকে নজর না দিয়ে বিক্রয়ের টাকা কত দ্রুত আদায় হচ্ছে, সেটিও পর্যবেক্ষণ করা জরুরি।

অতিরিক্ত পণ্য মজুত করলে টাকা আটকে যায়

অনেক ব্যবসায়ী মনে করেন, বেশি পণ্য মজুত থাকলে বিক্রয়ের সুযোগ বাড়বে। আবার সরবরাহকারীর কাছ থেকে ছাড় পাওয়ার আশায় প্রয়োজনের তুলনায় বেশি পণ্য কেনেন। কিন্তু সব পণ্য দ্রুত বিক্রি হয় না।

যেসব পণ্য দীর্ঘদিন গুদামে পড়ে থাকে, সেগুলোর মধ্যে ব্যবসার অর্থ আটকে যায়। সেই অর্থ দিয়ে নতুন পণ্য কেনা, কর্মচারীদের বেতন দেওয়া কিংবা অন্যান্য খরচ মেটানো কঠিন হতে পারে।

উদাহরণ

একটি প্লাস্টিক পণ্যের পাইকারি ব্যবসায়ীর গুদামে ২০ লাখ টাকার পণ্য রয়েছে।

এর মধ্যে:

  • ১২ লাখ টাকার পণ্য নিয়মিত বিক্রি হয়।
  • ৫ লাখ টাকার পণ্য ধীরগতিতে বিক্রি হয়।
  • ৩ লাখ টাকার পণ্য দীর্ঘদিন ধরে অবিক্রীত রয়েছে।

অর্থাৎ, ব্যবসার একটি উল্লেখযোগ্য অংশের অর্থ এমন পণ্যে আটকে আছে, যেগুলো দ্রুত নগদ অর্থে রূপান্তরিত হচ্ছে না। এ অবস্থায় নতুন পণ্য কেনার আগে মজুত বিশ্লেষণ করা দরকার।

কীভাবে সমাধান করবেন?

  • কোন পণ্য দ্রুত বিক্রি হয়, তা চিহ্নিত করুন।
  • Slow-moving ও Dead Stock আলাদা করে হিসাব রাখুন।
  • বিক্রয়ের চাহিদা অনুযায়ী ক্রয় পরিকল্পনা করুন।
  • অতিরিক্ত মজুত কমাতে প্রয়োজন অনুযায়ী মূল্যছাড় বা বিশেষ বিক্রয় পরিকল্পনা নিতে পারেন।
  • নিয়মিত Inventory Turnover বিশ্লেষণ করুন।

মনে রাখতে হবে, মজুত পণ্য ব্যবসার সম্পদ হলেও তা নগদ অর্থের বিকল্প নয়। পণ্য বিক্রি না হওয়া পর্যন্ত সেই অর্থ দিয়ে অন্যান্য বিল পরিশোধ করা সম্ভব নাও হতে পারে।

আরও পড়ুন: Working Capital কী? Working Capital হিসাব করার নিয়ম উদাহরণসহ।

ক্রেতার কাছ থেকে টাকা আদায়ে দেরি হয়

বাকিতে বিক্রয়ের পাশাপাশি পাওনা আদায়ে দুর্বল ব্যবস্থাপনাও নগদ অর্থের সংকট তৈরি করে।

ধরা যাক, ব্যবসার নিয়ম অনুযায়ী ক্রেতাকে ৩০ দিনের মধ্যে টাকা পরিশোধ করার কথা। কিন্তু বাস্তবে ক্রেতা ৬০ বা ৯০ দিন পর টাকা দিচ্ছেন। এদিকে ব্যবসাকে সরবরাহকারীর বিল, বেতন ও অন্যান্য খরচ নির্ধারিত সময়েই পরিশোধ করতে হচ্ছে। ফলে ব্যবসার নগদ অর্থের চক্র দীর্ঘ হয়ে যাচ্ছে।

পাওনা আদায়ের সময় কীভাবে বিশ্লেষণ করবেন?

Accounts Receivable Days বা পাওনা আদায়ের গড় সময় হিসাব করতে পারেন।

সূত্র:

Average Receivable Days = Average Accounts Receivable ÷ Net Credit Sales × Period Days

যদি বার্ষিক হিসাব করা হয়, তাহলে Period Days হিসেবে সাধারণত ৩৬৫ দিন ব্যবহার করা যায়।

উদাহরণ:

  • গড় পাওনা: ৬ লাখ টাকা
  • বার্ষিক বাকিতে বিক্রয়: ৭২ লাখ টাকা

Average Receivable Days = ৬,০০,০০০ ÷ ৭২,০০,০০০ × ৩৬৫ = প্রায় ৩০.৪ দিন

অর্থাৎ, গড়ে প্রায় ৩০ দিন সময় লাগছে পাওনা আদায় করতে। যদি এই সময় ক্রমাগত বাড়তে থাকে, তাহলে ব্যবসার নগদ অর্থের ওপর চাপ তৈরি হতে পারে।

সরবরাহকারীকে দ্রুত টাকা দিতে হয়, কিন্তু ক্রেতার টাকা আসে পরে

ব্যবসার নগদ প্রবাহের সংকট অনেক সময় অর্থ আদায় ও পরিশোধের সময়ের অসামঞ্জস্য থেকে তৈরি হয়।

ধরা যাক:

  • সরবরাহকারীকে ১৫ দিনের মধ্যে টাকা দিতে হয়।
  • ক্রেতার কাছ থেকে টাকা পাওয়া যায় ৪৫ দিন পরে।

এক্ষেত্রে ব্যবসাকে প্রায় ৩০ দিনের ব্যবধানের খরচ নিজস্ব অর্থ দিয়ে বহন করতে হবে। এই সময়ের জন্য পর্যাপ্ত কার্যকরী মূলধন না থাকলে ব্যবসায় টাকার সংকট দেখা দিতে পারে।

কীভাবে সমাধান করবেন?

  • সরবরাহকারীর সঙ্গে পেমেন্টের সময় নিয়ে আলোচনা করুন।
  • ক্রেতাদের কাছ থেকে দ্রুত টাকা আদায়ের ব্যবস্থা করুন।
  • ব্যবসার পরিচালন চক্র অনুযায়ী প্রয়োজনীয় Working Capital নির্ধারণ করুন।
  • বড় অর্ডার নেওয়ার আগে অর্থায়নের প্রয়োজন হিসাব করুন।

এখানে লক্ষ্য হওয়া উচিত, ব্যবসার নগদ অর্থের আগমন ও বহির্গমনের মধ্যে যতটা সম্ভব সামঞ্জস্য তৈরি করা।

ঋণের কিস্তি ও নতুন বিনিয়োগের কারণে নগদ অর্থ কমে যায়

ব্যবসা লাভ করলেও ঋণের মূল টাকা পরিশোধ, নতুন মেশিন কেনা, দোকান সম্প্রসারণ কিংবা মালিকের ব্যক্তিগত উত্তোলনের কারণে নগদ অর্থ কমে যেতে পারে।

এখানে একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, ঋণের মূল টাকা পরিশোধ সাধারণত Income Statement-এর ব্যয় নয়, কিন্তু এটি ব্যবসার নগদ অর্থ কমিয়ে দেয়।

অন্যদিকে, ঋণের সুদ সাধারণত ব্যবসার ব্যয় হিসেবে স্বীকৃত হয়।

উদাহরণ

একটি ব্যবসার মাসিক নিট লাভ ২ লাখ টাকা।

কিন্তু একই মাসে:

বিবরণ টাকা
নিট লাভ ২,০০,০০০
ঋণের মূল টাকা পরিশোধ ১,০০,০০০
নতুন যন্ত্রপাতি কেনা ৭০,০০০
মালিকের ব্যক্তিগত উত্তোলন ৫০,০০০
মোট নগদ বহির্গমন ২,২০,০০০

এখানে নিট লাভ ২ লাখ টাকা হলেও উল্লিখিত নগদ বহির্গমন ২ লাখ ২০ হাজার টাকা।

অর্থাৎ, লাভের পরিমাণের চেয়ে এই তিনটি কাজে নগদ অর্থের ব্যবহার বেশি হওয়ায় ব্যবসার হাতে থাকা টাকা কমতে পারে। এটি একটি সরল উদাহরণ। বাস্তবে লাভের সঙ্গে অবচয়, পাওনা, মজুত, সরবরাহকারীর বকেয়া ও অন্যান্য নগদ-অব নগদ পরিবর্তনও বিবেচনা করতে হবে।

কীভাবে সমাধান করবেন?

  • ব্যবসার লাভ ও নগদ প্রবাহ আলাদাভাবে বিশ্লেষণ করুন।
  • নতুন বিনিয়োগের আগে নগদ অর্থের প্রয়োজন হিসাব করুন।
  • ঋণের কিস্তি পরিশোধের পরিকল্পনা তৈরি করুন।
  • ব্যবসার অর্থ ও মালিকের ব্যক্তিগত অর্থ আলাদা রাখুন।
  • ব্যবসার দৈনন্দিন খরচের জন্য প্রয়োজনীয় নগদ রিজার্ভ বজায় রাখুন।

আরও পড়ুন : বিক্রি বেশি হলেও ব্যবসায় লাভ কম কেন? ১০টি সম্ভাব্য কারণ ও সমাধান

ব্যবসার Working Capital যথেষ্ট নয়

Working Capital বা কার্যকরী মূলধন হলো ব্যবসার চলতি সম্পদ ও চলতি দায়ের মধ্যকার পার্থক্য।

সূত্র:

Net Working Capital = Current Assets − Current Liabilities

যদি ব্যবসার চলতি সম্পদ ১২ লাখ টাকা এবং চলতি দায় ১০ লাখ টাকা হয়, তাহলে:

Net Working Capital = ১২,০০,০০০ − ১০,০০,০০০ = ২,০০,০০০ টাকা

এখানে নিট কার্যকরী মূলধন ২ লাখ টাকা। কিন্তু এই ১২ লাখ টাকার চলতি সম্পদের মধ্যে যদি ৮ লাখ টাকা মজুত পণ্য এবং ২ লাখ টাকা ক্রেতার কাছে পাওনা থাকে, তাহলে হাতে নগদ অর্থের পরিমাণ অনেক কম হতে পারে। অর্থাৎ, Net Working Capital ইতিবাচক হলেও ব্যবসার নগদ সংকট তৈরি হতে পারে।

Working Capital-এর পাশাপাশি কী দেখবেন?

  • হাতে ও ব্যাংকে ব্যবহারযোগ্য নগদ অর্থ
  • ক্রেতার কাছে পাওনা
  • পণ্যের মজুত
  • সরবরাহকারীর কাছে বকেয়া
  • স্বল্পমেয়াদি ঋণ ও অন্যান্য চলতি দায়
  • আগামী কয়েক সপ্তাহের সম্ভাব্য নগদ আদায় ও পরিশোধ

কার্যকরী মূলধনের অঙ্কের পাশাপাশি এর গঠন ও নগদে রূপান্তরের সময় বিশ্লেষণ করাও জরুরি।

ব্যবসার নগদ প্রবাহের পূর্বাভাস না থাকলে সংকট আগে থেকে বোঝা যায় না

অনেক ব্যবসায়ী প্রতিদিনের বিক্রয় ও খরচের হিসাব রাখেন, কিন্তু আগামী সপ্তাহ বা মাসে কত টাকা আসবে এবং কত টাকা পরিশোধ করতে হবে, তার পরিকল্পনা করেন না। ফলে বড় বিল পরিশোধের সময় হঠাৎ নগদ অর্থের ঘাটতি দেখা দেয়।

এ সমস্যা কমাতে Cash Flow Forecast তৈরি করা যেতে পারে।

একটি সহজ Cash Flow Forecast

বিবরণ টাকা
মাসের শুরুতে নগদ অর্থ ৩,০০,০০০
ক্রেতার কাছ থেকে সম্ভাব্য আদায় ৮,০০,০০০
মোট নগদ অর্থ ১১,০০,০০০
পণ্য কেনা ও সরবরাহকারীর বিল ৬,০০,০০০
বেতন ও অন্যান্য খরচ ২,০০,০০০
ঋণের কিস্তি ও অন্যান্য পরিশোধ ১,০০,০০০
মাস শেষে সম্ভাব্য নগদ অর্থ ২,০০,০০০

এই পূর্বাভাস থেকে বোঝা যায়, মাস শেষে ব্যবসার হাতে আনুমানিক ২ লাখ টাকা থাকতে পারে।

তবে ক্রেতার কাছ থেকে প্রত্যাশিত টাকা সময়মতো আদায় না হলে প্রকৃত নগদ অর্থ কম হবে। তাই Cash Flow Forecast নিয়মিত আপডেট করা প্রয়োজন।

ব্যবসায় টাকার সংকট শনাক্ত করার ৫টি লক্ষণ

নিচের লক্ষণগুলো দেখা গেলে ব্যবসার Working Capital ও Cash Flow বিশ্লেষণ করা উচিত।

১. সরবরাহকারীর বিল নির্ধারিত সময়ে পরিশোধ করা যাচ্ছে না।

২. বিক্রয় বাড়লেও ব্যাংক ব্যালেন্স বাড়ছে না।

৩. নতুন পণ্য কেনার জন্য বারবার স্বল্পমেয়াদি ঋণ নিতে হচ্ছে।

৪. ক্রেতার কাছে পাওনা ও অবিক্রীত মজুত ক্রমাগত বাড়ছে।

৫. কর্মচারীদের বেতন, ভাড়া বা অন্যান্য নিয়মিত খরচ পরিশোধে চাপ তৈরি হচ্ছে।

এই লক্ষণগুলো দেখা দিলে শুধু বিক্রয় বাড়ানোর চেষ্টা না করে নগদ অর্থ কোথায় আটকে আছে, তা শনাক্ত করা জরুরি।

ব্যবসায় লাভ হচ্ছে, তবুও টাকার সংকট হলে কী করবেন?

সমস্যার কারণ শনাক্ত করার পর কিছু ব্যবহারিক পদক্ষেপ নেওয়া যেতে পারে।

১. পাওনা আদায়ের পরিকল্পনা তৈরি করুন

ক্রেতাভিত্তিক পাওনার তালিকা তৈরি করুন। কত দিনের পাওনা, কত টাকা আদায়যোগ্য এবং কোন ক্রেতার কাছ থেকে টাকা পেতে দেরি হচ্ছে, তা পর্যালোচনা করুন।

২. অতিরিক্ত মজুত কমান

দীর্ঘদিন অবিক্রীত পণ্য শনাক্ত করুন। বিক্রয়ের চাহিদা অনুযায়ী নতুন পণ্য কেনার পরিকল্পনা করুন।

৩. নগদ প্রবাহের পূর্বাভাস তৈরি করুন

আগামী ৪ থেকে ১৩ সপ্তাহের সম্ভাব্য নগদ আদায় ও পরিশোধের হিসাব তৈরি করুন। এতে সম্ভাব্য ঘাটতি আগে থেকে বোঝা সহজ হবে।

৪. সরবরাহকারীর পেমেন্ট পরিকল্পনা করুন

ব্যবসার নগদ প্রবাহের সঙ্গে মিল রেখে সরবরাহকারীর বিল পরিশোধের সময় নির্ধারণ করুন।

৫. প্রয়োজনীয় Working Capital হিসাব করুন

ব্যবসার পরিচালন চক্র, মজুত, পাওনা, নিয়মিত খরচ ও চলতি দায়ের ভিত্তিতে কত কার্যকরী মূলধন প্রয়োজন, তা নির্ধারণ করুন।

৬. লাভ ও নগদ প্রবাহ আলাদাভাবে পর্যালোচনা করুন

প্রতি মাসে Income Statement, Balance Sheet এবং Cash Flow-এর তথ্য মিলিয়ে দেখুন। লাভ বাড়লেও নগদ অর্থ কেন কমছে, তা শনাক্ত করুন।

৭. জরুরি নগদ রিজার্ভ রাখুন

ব্যবসার ধরন ও নগদ প্রবাহ অনুযায়ী কিছু অর্থ জরুরি প্রয়োজনের জন্য সংরক্ষণ করুন। তবে কত টাকা রিজার্ভ প্রয়োজন, তা ব্যবসার নিয়মিত খরচ ও ঝুঁকি বিবেচনা করে নির্ধারণ করতে হবে।

সাধারণ প্রশ্নোত্তর

ব্যবসায় লাভ হচ্ছে, তবুও টাকা থাকে না কেন?

বাকিতে বিক্রয়, ক্রেতার কাছ থেকে টাকা আদায়ে দেরি, অতিরিক্ত মজুত, ঋণের মূল টাকা পরিশোধ, নতুন বিনিয়োগ এবং মালিকের ব্যক্তিগত উত্তোলনের কারণে নগদ অর্থ কমে যেতে পারে।

লাভ ও Cash Flow কি একই?

না। লাভ হলো আয় থেকে ব্যয় বাদ দেওয়ার পর হিসাবের ফলাফল। Cash Flow হলো নির্দিষ্ট সময়ে নগদ অর্থের আগমন ও বহির্গমন।

Working Capital বেশি থাকলে কি নগদ সংকট হবে না?

এমন নিশ্চয়তা নেই। চলতি সম্পদের বড় অংশ যদি মজুত পণ্য বা অনাদায়ী পাওনা হয়, তাহলে Net Working Capital ইতিবাচক হলেও নগদ সংকট তৈরি হতে পারে।

ব্যবসার টাকার সংকট কমানোর সবচেয়ে কার্যকর উপায় কী?

প্রথমে পাওনা আদায়ের সময়, মজুতের পরিমাণ, সরবরাহকারীর পেমেন্ট এবং আগামী কয়েক সপ্তাহের নগদ প্রবাহ বিশ্লেষণ করতে হবে। এরপর যে জায়গায় অর্থ আটকে আছে, সেটি অনুযায়ী ব্যবস্থা নিতে হবে।

বিক্রয় বাড়লেই কি ব্যবসার নগদ অর্থ বাড়বে?

সব সময় নয়। বিক্রয়ের বড় অংশ বাকিতে হলে বা বিক্রয় বাড়ানোর জন্য অতিরিক্ত মজুত কিনতে হলে নগদ অর্থের প্রয়োজন আরও বাড়তে পারে।

উপসংহার

ব্যবসায় লাভ হওয়া অবশ্যই ভালো লক্ষণ। কিন্তু লাভের হিসাব থাকলেই ব্যবসার হাতে পর্যাপ্ত নগদ অর্থ থাকবে, এমন নয়।

বাকিতে বিক্রয়, ক্রেতার কাছ থেকে টাকা আদায়ে দেরি, অতিরিক্ত পণ্য মজুত, সরবরাহকারীর বিল পরিশোধের চাপ এবং নতুন বিনিয়োগ—এসব কারণে ব্যবসার অর্থ বিভিন্ন জায়গায় আটকে থাকতে পারে।

একজন ব্যবসায়ীর তাই শুধু বিক্রয় ও লাভের হিসাব রাখলেই চলবে না। তাঁকে নিয়মিত Working Capital, Cash Flow, পাওনা আদায়ের সময় এবং মজুতের গতি বিশ্লেষণ করতে হবে।

মনে রাখবেন, ব্যবসার লাভ আপনাকে বলে ব্যবসা কতটা আয় করেছে, আর Cash Flow আপনাকে বলে সেই আয় থেকে কত টাকা বাস্তবে হাতে এসেছে।

যে ব্যবসায়ী এই দুই হিসাবের মধ্যে সম্পর্ক বুঝতে পারেন, তিনি নগদ অর্থের সংকট আগেভাগে শনাক্ত করতে এবং ব্যবসার দৈনন্দিন কার্যক্রম আরও ভালোভাবে পরিচালনা করতে পারেন।

RELATED ARTICLES

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

Most Popular