রিয়েল এস্টেট ব্যবসা কি?
জমি, ফ্ল্যাট, বাড়ি, প্লট, কমার্শিয়াল স্পেস (দোকান, অফিস, মার্কেট) ইত্যাদি ক্রয়- বিক্রয়, ভাড়া দেওয়া এবং ডেভেলপ করে বিক্রেতার কাছে বিক্রি করাই হচ্ছে রিয়েল এস্টেট ব্যবসা। এটাকে ডেভেলপার ব্যবসাও বলে।
সহজভাবে বললে, জমি বা স্থাবর সম্পত্তি কিনে বা বর্তমান মালিকদের সাথে নির্দিষ্ট অনুপাতে স্থাপনার মালিকানার অংশ ভাগ করা হবে এই চুক্তিতে স্থাপনার উন্নয়ন করে গ্রাহকদের কাছে বিক্রি করা বা ভাড়া দেওয়া হচ্ছে রিয়েল এস্টেট ব্যবসা।
রিয়েল এস্টেট ব্যবসার ধরণ
রিয়েল এস্টেট ব্যবসা বা ডেভেলপার ব্যবসার বিভিন্ন ধরণ রয়েছে। যেমন:
ল্যান্ড ডেভেলপমেন্ট: ব্যক্তিগত জমি কিনে প্লট করে বিক্রি করা।
ফ্ল্যাট ডেভেলপমেন্ট: ভবন নির্মাণ করে ফ্ল্যাট বিক্রি করা,
ব্রোকারেজ/এজেন্সি: জমি/ফ্ল্যাট বিক্রির মাধ্যমে কমিশন নেওয়া।
ভাড়া ভিত্তিক ব্যবসা: বাড়ি, দোকান, অফিস ভাড়া দিয়ে আয় করা।
কমার্শিয়াল রিয়েল এস্টেট: শপিং কমপ্লেক্স, অফিস স্পেস ডেভেলপ করে বিক্রি করা বা ভাড়া দেওয়া।
রিয়েল এস্টেট ইনভেস্টমেন্ট: ভবিষ্যৎ লাভের জন্য সম্পত্তি ধরে রাখা এবং দাম বৃদ্ধি পেলে বিক্রি করে দেওয়া।
কিভাবে রিয়েল এস্টেট ব্যবসা শুরু করবো?
রিয়েল এস্টেট ব্যবসা শুরু করতে নিচের ধাপগুলো অনুসরণ করুন:
ধাপ ১: রিয়েল এস্টেট সম্পর্কে জ্ঞান অর্জন করুন
রিয়েল এস্টেট ব্যবসা শুরু করার আগে আপনাকে প্রথমেই এই ব্যবসা সম্পর্কে ভাল করে জানতে হবে। ভাল করে না জেনে এই ধরণের ব্যবসা শুরু করা ঠিক হবে না।
এক্ষেত্রে আপনার উচিত হবে কোন ডেভলপার কোম্পানিতে চাকরি করে অভিজ্ঞতা নেওয়া৷ আবার আপনি চাইলে ডেভেলপার ব্যবসায় অভিজ্ঞ কোন পার্টনার নিয়ে কাজ করতে পারেন।
যাই হোক নিচের বিষয়গুলো সম্পর্কে প্রথমেই জেনে নিন:
- জমি সম্পর্কিত সকল ডকুমেন্টস যেমন দলিল, খতিয়ান, নামজারি, ডিসিআর, মৌজাম্যাপ ইত্যাদি।
- RAJUK / সিটি কর্পোরেশন আইন,
- বিল্ডিং কোড ও প্ল্যান অনুমোদন,
- রেজিস্ট্রেশন ও কর ব্যবস্থা,
ধাপ-২ বাজার গবেষণা
রিয়েল এস্টেট ব্যবসায় নামার আগে বাজার নিয়ে ভালভাবে গবেষণা করে নিন। বাজার গবেষণা ছাড়া এই ধরণের ব্যবসায় নামবেন না।
বাজার গবেষণার মধ্যে থাকবে:
- আপনার প্রতিযোগি কারা? তারা কিভাবে ব্যবসা করছে?
- কোন এলাকায় জমির দাম কেমন?
- মানুষ কোন ধরণের ফ্ল্যাট বেশি পছন্দ করে?
- আপনি যে ধরনের রিয়েল এস্টেট ব্যবসা করবেন
- আপনার এলাকায় তার চাহিদা কেমন?
- আপনার নিজস্ব আর্থিক সক্ষমতা এই ধরণের ব্যবসার জন্য উপযুক্ত সেটিও আপনাকে দেখতে হবে।
ধাপ ৩: কোন মডেলে শুরু করবেন ঠিক করুন
উপরে আমি রিয়েল এস্টেট ব্যবসার মডেল/ধরণ নিয়ে আলোচনা করেছি। এই ব্যবসা শুরু করার আপনাকে মডেল ঠিক করতে হবে। যে মডেলটি আপনার জন্য পারফেক্ট হবে সেটি দিয়েই শুরু করুন।
নতুনদের জন্য রিয়েল এস্টেট ব্রোকার/এজেন্ট হিসেবে শুরু করতে পারেন। এখানে পুঁজি কম এবং ঝুঁকিও কম ও ক্যাশফ্লো যথেষ্ট দ্রুত হয়। এরপর ধীরে ধীরে যেতে পারেন
ছোট প্লট ডেভেলপমেন্ট ও যৌথ বিনিয়োগে ফ্ল্যাট নির্মাণ করতে পারেন।
ধাপ ৪: প্রাথমিক পুঁজি নির্ধারণ করুন
এই পর্যায়ে আপনার প্রাথমিক পুঁজি কত হবে সেটি নির্ধারণ করুন। ব্যবসার মডেলভেদে পুঁজি ভিন্ন হয়। নিচে এই বিষয়ে বিস্তারিত আলোচনা করা হয়েছে।
ধাপ ৪: ডকুমেন্টেশন ও আইনি প্রক্রিয়া সম্পন্ন
বাংলাদেশে রিয়েল এস্টেট ব্যবসা করতে হলে আপনাকে বিভিন্ন ধরণের ডকুমেন্টস সংগ্রহ করতে হবে। এর পাশাপাশি আইনি যেসব প্রক্রিয়া আছে সেগুলো সম্পন্ন করতে হবে।
এসবের মধ্যে রয়েছে:
- ট্রেড লাইসেন্স সংগ্রহ করা,
- TIN সার্টিফিকেট সংগ্রহ করা,
- ব্যাংক একাউন্ট খোলা,
- রিয়েল এস্টেট কোম্পানি হলে RJSC রেজিস্ট্রেশন সম্পন্ন করা,
- ম্যামোরেন্ডাম অব এসোসিয়েশন ও আর্টিকেলস অব এসোসিয়েশন তৈরি করা,
- (ডেভেলপার হলে) REHAB সদস্যপদ,
- অংশীদার নিয়ে ব্যবসা করতে চাইলে অংশীদারী চুক্তিপত্র তৈরি করা এবং RJSC রেজিস্ট্রেশন সম্পন্ন করা,
ধাপ ৫ : অফিস নেওয়া ও লোকবল নিয়োগ দেওয়া
ডকুমেন্টেশন ও আইনি প্রক্রিয়া এর পাশা আপনাকে একটি অফিস নিতে হবে ও লোকবল নিয়োগ দিতে হবে। যেসব লোক নিয়োগ দিতে হবে তাদের মধ্যে থাকবে:
- জমি সার্ভেয়ার
- আইনজীবী
- ইঞ্জিনিয়ার
- মার্কেটিং পার্টনার
- বিশ্বস্ত দালাল/এজেন্ট
এছাড়া জমির কাগজপত্র ভালভাবে বুঝে এবং সাব-রেজিস্ট্রি অফিসে যোগাযোগ আছে এমন ব্যক্তিও আপনার প্রয়োজন হবে।
ধাপ ৬: লোকেশন ও প্রপার্টি নির্বাচন
সবকিছু ঠিক হওয়ার পর আপনাকে লোকেশন নির্বাচন করতে এবং কোন প্রপার্টি নিয়ে কাজ করবেন সেটি ঠিক করতে হবে।
ভালো লোকেশন মানেই লাভ, সেই লোকেশন হতে পারে:
- শহরের আশেপাশের এলাকা
- নতুন রাস্তা বা ফ্লাইওভার সংলগ্ন
- ইন্ডাস্ট্রিয়াল বা ইকোনমিক জোনের কাছে,
- স্কুল, হাসপাতাল, মার্কেট সংলগ্ন এলাকা,
আরও পড়ুন: ব্যাংক লোন কত প্রকার ও কি কি? ব্যাংক লোন পাওয়ার উপায়।
ধাপ ৬: মার্কেটিং ও সেলস স্ট্র্যাটেজি
রিয়েল এস্টেট ব্যবসা শুরু করার পর সেই ব্যবসায় টিকে থাকা ও মার্কেট শেয়ার বাড়ানোর অন্যতম হাতিয়ার হচ্ছে সঠিক মার্কেটিং ও সেলস স্ট্র্যাটেজি এপ্লাই করা। নিচে মার্কেটিং ও সেলস স্ট্র্যাটেজি নিয়ে আলোচনা করা হলো:
রিয়েল এস্টেট কোম্পানির কার্যকর মার্কেটিং কৌশল
১. টার্গেট কাস্টমার ঠিক করুন
মার্কেটিং শুরুর প্রথম দিকেই আপনার টার্গেট কাস্টমার কে সেটি ঠিক করুন। কারণ টার্গেট কাস্টমার ঠিক না করে আপনি যদি মার্কেটিং করেন তাহলে আপনার অর্থের অপচয় হবে এবং ফল পাবেন কম।
বিভিন্ন ধরণের কাস্টমার আছে তাদের চাহিদাও ভিন্ন। যেমন :
মিডল ক্লাস ফ্যামিলি: চাহিদা ১,২০০–১,৫০০ ফুটের ফ্ল্যাট।
প্রবাসী: চাহিদা নিরাপদ বিনিয়োগ।
ব্যবসায়ী: চাহিদা দোকান/কমার্শিয়াল স্পেস
ইনভেস্টর: চাহিদা ভবিষ্যৎ মূল্য বৃদ্ধি
একেক গ্রুপের ভাষা, কনটেন্ট ও অফার আলাদা হতে হবে। আপনি যাদের টার্গেট করবেন তাদের চাহিদা অনুযায়ী মার্কেটিং করবেন এবং অফার দিবেন।
২️. ব্র্যান্ডিং: বিশ্বাস তৈরি না হলে বিক্রি হবে না
গ্রাহকদের আস্থা অর্জন ছাড়া আপনার লক্ষ্য অর্জন হবে না। এই আস্থা তৈরি করার জন্য আপনাকে ব্র্যান্ডিং এ জোর দিতে হবে। এজন্য আপনাকে যা করতে হবে:
- প্রফেশনাল লোগো ও নাম ব্যবহার করতে হবে,
অফিস অ্যাড্রেস ও ট্রেড লাইসেন্স দৃশ্যমান রাখতে হবে, - পূর্বের প্রজেক্টসমূহের ছবি ক্লায়েন্টদের রিভিউ নিজের ওয়েবসাইট ও সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে প্রচার করতে হবে।
- Google Business Profile তৈরি করা,
সব যায়গায় প্রফেশনালিজম বজায় রাখুন। এটি ব্র্যান্ডিং এর ক্ষেত্রে বড় ভূমিকা পালন করে।
৩️. ডিজিটাল মার্কেটিং
ডিজিটাল মার্কেটিং হচ্ছে ডিজিটাল প্লাটফর্ম ব্যবহার করে মার্কেটিং কার্যক্রম পরিচালনা করা। এর মধ্যে রয়েছে:
সার্চ ইঞ্জিন অপটিমাইজেশন
সোশ্যাল মিডিয়া মার্কেটিং
ভিডিও মার্কেটিং
কন্টেন্ট মার্কেটিং
ইমেইল মার্কেটিং
ইনফ্লুয়েন্সার মার্কেটিং ইত্যাদি।
ডিজিটাল মার্কেটিং এর মাধ্যমে আপনি খুব সহজেই দ্রুত ও কম খরচে টার্গেট কাস্টমারের নিকট পৌঁছাতে পারবেন। এক্ষেত্রে ফেসবুক এডস এবং গুগল এডস খুব গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।
কনটেন্ট আইডিয়া:
- এই দামে ঢাকায় ফ্ল্যাট সম্ভব?
- ১০ বছরে এই এলাকায় জমির দাম কত বেড়েছে
- ফ্ল্যাট কিনবেন? ৫টা ভুল আগে জানুন
ভিডিও গ্রাহকদের আস্থা বাড়াতে সাহায্য করে। তাই বিভিন্ন ধরণের ভিডিও কন্টেন্ট তৈরি করে ইউটিউব ও ফেসবুকে প্রচার করুন। যেসব ভিডিও বানাবেন:
- সাইট ভিজিট ভিডিও
- ড্রোন শট (সম্ভব হলে)
- লাইভ প্রজেক্ট আপডেট
- কিস্তিতে ফ্ল্যাট কেনার গাইড
৪. ওয়েবসাইট ও ল্যান্ডিং পেজ
অবশ্যই নিজস্ব ওয়েবসাইট থাকতে হবে। এছাড়া অন্তত ১টা ল্যান্ডিং পেজ থাকতেই হবে। ল্যান্ডিং পেজে নিচের বিষয়গুলো থাকবে:
- প্রজেক্ট ডিটেইল
- দাম
- লোকেশন ম্যাপ
- Call Now / WhatsApp Button
বিজ্ঞাপন দিয়ে আপনি যখন আপনার ল্যান্ডিং পেজে ভিজটর পাঠাবেন তখন মানুষ ল্যান্ডিং পেজের কন্টেন্ট ভাল করে দেখবে এবং ক্রয় সিদ্ধান্ত নিবে।
৫. লোকাল মার্কেটিং
অবশ্যই লোকাল মার্কেটিং করবেন কারণ বয়স্ক মানুষের মধ্যে অনেকেই ডিজিটাল মাধ্যমে বেশি সক্রিয় থাকে না। লোকাল মার্কেটিং এর জন্য যা করবেন:
- প্রজেক্ট সাইটে বড় সাইনবোর্ড টানাবেন,
- স্থানীয় দালাল/এজেন্ট নেটওয়ার্ক এর মাধ্যমে প্রচারণা চালানো,
- লিফলেট (টার্গেটেড এলাকায়) বিতরণ করা,
- মসজিদ/মার্কেট আশেপাশে ব্যানার টানানো,
৬. রেফারেল মার্কেটিং
রেফারেল মার্কেটিং এর মাধ্যমে আপনি কম খরচে কাস্টমার আনতে পারবেন। এজন্য যে রেফার করবে তার জন্য কিছু সুবিধা রাখুন যেমন কমিশন প্রদান, গিফট, বিদেশে ঘুরার টিকিট ইত্যাদি।
রিয়েল এস্টেট সেলস স্ট্র্যাটেজি
রিয়েল এস্টেট বা ডেভেলপার ব্যবসায় সেলস স্ট্র্যাটেজি খুব গুরুত্বপূর্ণ। আপনার সেলস স্ট্র্যাটেজি যত ভাল হবে আপনার বিক্রয় তত বেশি হবে।
মনে রাখবেন কাস্টমার একদিনে তৈরি হয় না। এজন্য তাদের পেছনে সময় দিয়ে ভয় ও সন্দেহ দূর করে বিশ্বাস তৈরি করতে হয়।
কয়েকটি ধাপে আমি সেলস স্ট্র্যাটেজি নিয়ে আলোচনা করেছি।
১. মিটিং এর আগের প্রস্তুতি
প্রথমে কাস্টমার সম্পর্কে ভাল করে জানুন। কাস্টমার কি চায় অর্থাৎ তার চাহিদা ও সঙ্গতি কেমন। এছাড়া আরো কিছু বিষয় সম্পর্কে জেনে নিন যেমন :
- বাজেট
- কেনার উদ্দেশ্য (থাকা / বিনিয়োগ)
- পরিবার সদস্য
- কেনার সময়কাল
২. First Impression Strategy (প্রথম ৫ মিনিট)
আপনি বিশ্বাসযোগ্য কিনা গ্রাহকরা প্রথম ৫ মিনিটের মধ্যেই সিদ্ধান্ত নিবে। গ্রাহকদের কাছে নিজেকে বিশ্বাসযোগ্য করতে যা করবেন:
- পরিষ্কার ও রুচিশীল পোশাক পড়ে গ্রাহকের সাথে দেখা করুন এবং প্রফেশনাল ভাষা ব্যবহার করুন,
- আত্মবিশ্বাসী থাকুন কিন্তু অহংকার করবেন না,
সরাসরি দাম নয় প্রথমে সমস্যা নিয়ে কথা বলুন।
গ্রাহকের সাথে প্রথমেই বলতে পারেন “আপনি ফ্ল্যাট কিনছেন নিরাপদ ভবিষ্যতের জন্য আমি সেটাই নিশ্চিত করতে চাই।”
৩. প্রয়োজন অনুযায়ী উপস্থাপন (ফ্ল্যাট নয়, সমাধান দেখান)
১৫০০ স্কয়ার ফুট, ৩ বেড, ২ বাথ বলার চেয়ে গ্রাহকের প্রয়োজন অনুযায়ী উপস্থাপন করুন। যেমন:
- আপনার দুই সন্তান নিরাপদ পরিবেশে বড় হবে”
- স্কুল, মার্কেট, বা হাসপাতাল কাছে”
- ভবিষ্যতে দাম বাড়বে” ইত্যাদি।
৪️. সাইট ভিজিট / ভিজুয়াল উপস্থাপনা
গ্রাহকের সাথে মিটিং এর সময় সাইট এবং ফ্ল্যাটের রিয়েল ছবি দেখান। এর পাশাপাশি বিল্ডিং ও ফ্ল্যাটের ভিডিও দেখান। যদি নির্মাণ না হয়ে থাকে তাহলে 3D ভিডিও দেখাতে পারেন। ফ্লোর প্ল্যান সম্পর্কে বলুন। তারপর সাইট ভিজিট এর অফার দিন।
৫. দাম বলার কৌশল
দাম বলার সঠিক ফরম্যাট
- মোট মূল্য
- বুকিং মানি
- কিস্তি ভেঙে দেখান
- মাসিক চাপ কেমন সেটি বলুন,
উদাহরণ: গ্রাহককে বলুন “৫০ লাখ শুনতে বড় লাগতে পারে, কিন্তু মাসে কিস্তি মাত্র ৩৫ হাজার টাকা যা বাসা ভাড়ার মতোই।”
৬. তুলনা করে বোঝান
কাস্টমার সবসময় তুলনা করে। তাই তাকে তুলনা করে দামের যৌক্তিকতা তুলে ধরুন। তুলনার বিষয় হচ্ছে:
- লোকেশন
- নির্মাণ কোয়ালিটি
- কিস্তি সুবিধা
- ভবিষ্যৎ মূল্য বৃদ্ধি
আপনার প্রতিদ্বন্দ্বীকে খাটো করবেন না। কিন্তু অন্যদের তুলনায় আপনার ফ্ল্যাটের দাম বেশি হলে তার যৌক্তিকতাও তুলে ধরুন।
আরও পড়ুন: বেকারি ব্যবসা শুরু করার গাইডলাইন। খরচ লাভসহ বিস্তারিত।
৭. রিটার্ন অন ইনভেস্টমেন্ট
যারা বিনিয়োগ করতে চায় তাদের জন্য এই কৌশল ব্যবহার করবেন। তাদেরকে দেখান:
- ৫ বছরে দাম কত বাড়তে পারে
- ভাড়া সম্ভাবনা
- এলাকার ডেভেলপমেন্ট
এক্ষেত্রে চার্ট ব্যবহার করে গ্রাহককে হাতে কলমে বুঝাতে পারেন।
৮️. আপত্তি সামলানো
গ্রাহকরা বিভিন্ন ধরণের আপত্তি করতে পারে। এক্ষেত্রে আপনাকে ইতিবাচকভাবে আপত্তি সামলাতে হবে। সবচেয়ে বড় আপত্তি হচ্ছে দাম ও লোকেশন।
তাই গ্রাহকের সাথে মিটিং এর আগেই এই ব্যাপারে কিছু উত্তর সাজিয়ে রাখুন যাতে দ্রুত উত্তর দিয়ে গ্রাহককে কনভিন্স করতে পারেন।
৯. আলোচনা শেষ করার কৌশল
আলোচনা শেষে অবশ্যই অফার দিতে ভুলবেন না। অফার দেওয়ার জন্য বলতে পারেন
“এই ইউনিটটা আপনার পরিবারের জন্য ভালো হবে, বুকিং রাখি?”
আরো বেশি মনস্তাত্ত্বিক কৌশল প্রয়োগ করতে পারেন। যেমন বলতে পারেন: আর মাত্র কয়েকটা ফ্ল্যাট বাকি আছে, সামনে দাম বাড়তে পারে, আজকে বুকিং দিলে % ছাড় আছে।
বেশিরভাগ সময় দেখা যায় ফলো আপ পিরিয়ডেই বেশি বিক্রি হয়। ফলো আপ করার জন্য যা করতে পারেন :
১ম দিন: ধন্যবাদ জানান ও মিটিং এর সারাংশ নিয়ে আলোচনা করুন,
৩য় দিন: নতুন তথ্য থাকলে ক্লায়েন্টকে জানান,
৭ম দিন: অফার/রিমাইন্ডার দিন,
১৫তম দিন: সিদ্ধান্ত নিতে সহায়তা করুন,
রিয়েল এস্টেট ব্যবসা শুরু করতে কেমন খরচ ও লাভ হয়?
রিয়েল এস্টেট ব্রোকার/এজেন্ট হিসেবে শুরু করলে
প্রাথমিক খরচ
|
খরচের খাত |
আনুমানিক টাকা |
| ট্রেড লাইসেন্স |
৩,০০০ – ৮,০০০ |
|
অফিস ভাড়া (ছোট) |
১০,০০০ – ২৫,০০০ |
| ফেসবুক/অনলাইন মার্কেটিং |
৫,০০০ – ২০,০০০ |
|
ভিজিটিং কার্ড, ব্যানার |
২,০০০ – ৫,০০০ |
|
যাতায়াত ও ফোন খরচ |
৫,০০০ – ১০,০০০ |
| মোট |
৩০,০০০ – ৭০,০০০ |
লাভ
জমি বিক্রিতে কমিশন: ১% – ৩%
ফ্ল্যাট বিক্রিতে কমিশন: ১% – ২%
যেমন: ২০ লাখ টাকার জমি বিক্রি করলে ২% কমিশন = ৪০,০০০ টাকা আয়। মাসে ২-৩টি ডিল হলে = ৮০,০০০ – ১,২০,০০০ টাকা আয়।
প্লট ব্যবসা (ল্যান্ড ডেভেলপমেন্ট)
খরচ (ছোট পরিসরে)
|
খরচের খাত |
আনুমানিক টাকা |
| জমি ক্রয় (১০–২০ কাঠা) |
১৫–৪০ লাখ |
|
নামজারি ও দলিল |
২–৪% |
| রাস্তা/প্লটিং |
২–৫ লাখ |
|
মার্কেটিং |
৫০,০০০ – ১ লাখ |
| মোট বিনিয়োগ |
১৮ – ৪৮ লাখ |
যায়গার দাম নির্দিষ্ট করে বলা কঠিন। একেক এলাকায় যায়গার দাম একেক রকম।
প্লট আকারে বিক্রি করলে লাভ: ২০% – ৬০%
ফ্ল্যাট ডেভেলপমেন্ট ব্যবসা
খরচ (৫ তলা ছোট বিল্ডিং)
|
খরচের খাত |
আনুমানিক টাকা |
|
জমি |
৬০ লাখ – ১.৫ কোটি |
| নির্মাণ ব্যয় |
১ – ২ কোটি |
|
অনুমোদন ও নকশা |
৫ – ১০ লাখ |
| মার্কেটিং |
৩ – ৫ লাখ |
|
মোট বিনিয়োগ |
২ – ৩.৫ কোটি |
লাভ: ডেভেলপার ব্যবসায় ১৫% – ৩০% লাভ হয়।
উদাহরণ: মোট খরচ ২.৫ কোটি, বিক্রি ৩.১ কোটি। লাভ হবে ৬০ লাখ।
ভাড়া ভিত্তিক রিয়েল এস্টেট
খরচ
ফ্ল্যাট/দোকান কিনতে ৩০ লাখ – ১ কোটি কোটি টাকা খরচ হতে পারে।
লাভ
- মাসিক ভাড়া: ১% – ২%
- বার্ষিক ROI: ৮% – ১৫%
- সাথে সম্পত্তির মূল্য বৃদ্ধি আলাদা
উদাহরণ: ৫০ লাখের ফ্ল্যাট → মাসিক ভাড়া ২৫,০০০
বছরে আয় ৩ লাখ + মূল্য বৃদ্ধি
কোন মডেলে কত ঝুঁকি ও লাভ?
|
মডেল |
ঝুঁকি | লাভ |
|
ব্রোকারেজ |
খুব কম | মাঝারি |
|
প্লট ব্যবসা |
মাঝারি |
বেশি |
| ফ্ল্যাট ডেভেলপমেন্ট | বেশি |
বেশি |
| ভাড়া ভিত্তিক | কম |
স্থায়ী |
বাংলাদেশে রিয়েল এস্টেট ব্যবসার সম্ভাবনা

দ্য বিজনেস স্ট্যান্ডার্ড এর এক রিপোর্টে বলা হয়েছে ২০২৪ সালে বাংলাদেশের রিয়েল এস্টেট বাজারের সাইজ ছিল ২.৬৮ ট্রিলিয়ন ডলার যা ২০২৮ সালে ৩.৫৩ ট্রিলিয়ন ডলারে পৌঁছাতে পারে। ২০২৪ সালে ২৪,০০০ কোটি টাকার ফ্ল্যাট বিক্রি হয়েছে।
Wresearch এর প্রতিবেদনে বলা হয়েছে ২০২৫-৩১ পর্যন্ত এই খাতে প্রতি বছর প্রায় ৭.৯% হারে বৃদ্ধি পেতে পারে।
Ngital এর রিপোর্ট মতে, ঢাকা নগরীতে প্রতিটি বছর প্রায় ৬০,০০০ – ১২০,০০০ নতুন বাড়ির প্রয়োজন কিন্তু বিপরীতে ২৫,০০০ ইউনিট সরবরাহ করা যাচ্ছে।
এসব তথ্য উপাত্ত থেকে বুঝা যায় বাংলাদেশে রিয়েল এস্টেট মার্কেট সাইজ দিন দিন বৃদ্ধি পাচ্ছে। বিশেষ করে ঢাকা ও চট্টগ্রামের মতো শহরে চাহিদা বেশি বাড়ছে। প্রবাসীরা রিয়েল এস্টেট বাজার বৃদ্ধিতে ভাল ভূমিকা পালন করছে।
বিজনেস স্ট্যান্ডার্ড এর অন্য এক রিপোর্টে বলা হয়েছে ছোট এবং মাঝারি ফ্ল্যাটের চাহিদা বেশি। অন্যদিকে KGRE এর রিপোর্ট বলা হয়েছে ই-কমার্স, স্টার্টআপ বৃদ্ধি এবং বাণিজ্য সম্প্রসারণের কারণে অফিস/বাণিজ্যিক জায়গার চাহিদা বাড়ছে।
কিছু চ্যালেঞ্জও আছে, যেমন:
ভূমি ও দলিল সংক্রান্ত জটিলতা আছে। ভূমি অফিসে নানা হয়রানিও মোকাবিলা করতে হয়।
উচ্চ নির্মাণ খরচ ও ব্যাংক ঋণ সীমাবদ্ধতা ব্যবসাকে কঠিন করে তুলতে পারে।
রিয়েল এস্টেট ব্যবসায় সফল হওয়ার বাস্তব পরামর্শ
১. বিশ্বাসযোগ্যতা হচ্ছে সবচেয়ে বড় সম্পদ। এই বিশ্বাস অর্জন করার জন্য দামে স্বচ্ছতা থাকতে হবে, মিথ্যা প্রতিশ্রুতি দেওয়া যাবে না, ডকুমেন্টস সঠিক থাকতে হবে।
২. শুরুতে অল্প বিনিয়োগ করুন তারপর ধীরে ধীরে বিনিয়োগ বাড়ান। প্রথমে ব্রোকার/এজেন্ট হিসেবে বা যৌথ বিনিয়োগে ছোট প্লট, ২–৩ ইউনিটের ছোট ফ্ল্যাট দিয়ে শুরু করতে পারেন।
৩. লোকেশন বাছাইয়ে সিরিয়াস হতে হবে। লোকেশন নির্বাচন করার ক্ষেত্রে বিবেচনা করুন:
- ভবিষ্যৎ রাস্তা/মেট্রো/ব্রিজ
- নতুন আবাসিক এলাকা
- ইন্ডাস্ট্রিয়াল জোনের আশেপাশে
তবে সরকারি খাস যায়গার মধ্যে হলে অবশ্যই এড়িয়ে যাবেন।
৪. কাগজপত্রে একচুলও ছাড় দেবেন না। ৯০% সমস্যার কারণ হচ্ছে দলিল সমস্যা। তাই চুক্তি করার আগে চেক করবেন—
- CS, SA, RS, BRS
- নামজারি
- দখল অবস্থা
- মামলা জটিলতা
অভিজ্ঞ আইনজীবী দিয়ে সবকিছু চেক করাবেন তাহলে ভবিষ্যতে সমস্যা এড়াতে পারবেন।
৫. ক্যাশফ্লো নিয়ন্ত্রণে রাখুন। ক্যাশটাকা না থাকলে প্রতিষ্ঠান যতই লাভজনক থাকুক না কেন ব্যবসা বন্ধ হয়ে যাবে টাকার অভাবে। তাই ক্যাশফ্লো ঠিক রাখার জন্য জমি ক্রয়, কিস্তি প্ল্যান, বুকিং মানি, পার্টনারশিপ এসব বিষয়ে খুব হিসেব করে সিদ্ধান্ত নিতে হবে।
৬. মার্কেটিংকে খরচ নয় বিনিয়োগ ভাবুন। ডিজিটাল মার্কেটিং এবং প্রচলিত মার্কেটিং উভয় পদ্ধতিতে মার্কেটিং করুন। তবে ডিজিটাল মার্কেটিং এ বেশি জোর দিন।
৮. বিক্রয় নয়, সমাধান বিক্রি করুন। গ্রাহকের সমস্যা যত সমাধান করবেন তত আপনার বিক্রয় বাড়বে।
৯. নেটওয়ার্ক তৈরি করুন কারণ রিয়েল এস্টেট একা করা যায় না। এজন্য দালাল/ব্রোকার, আইনজীবী, ইঞ্জিনিয়ার ব্যাংক অফিসার ইত্যাদির সাথে নেটওয়ার্ক তৈরি করুন।নেটওয়ার্ক যত বড়, ডিল তত সহজ।
১০. অতিরিক্ত লোনে যাবেন না। কারণ লোন চাপ ও ঝুঁকি দুটোই বাড়ায়। তাই নিজের মূলধন কম থাকলে যৌথ বিনিয়োগ করতে পারেন। আর লোন করলেও সেটা ধাপে ধাপে এবং নিজের সক্ষমতার ভেতর করবেন।
১১. বাজার বুঝে দাম ঠিক করুন।
রিয়েল এস্টেট ব্যবসার আর্থিক ব্যবস্থাপনা
রিয়েল এস্টেট বা ডেভেলপার ব্যবসায় আর্থিক ব্যবস্থাপনা খুবই গুরুত্বপূর্ণ। কারণ এর উপর নির্ভর করবে আপনি এই ব্যবসায় টিকে থাকতে পারবেন না। নিচে এই বিষয়ে আলোচনা করা হলো:
১. আলাদা বিজনেস ফাইন্যান্স সেটআপ করুন। সবচেয়ে বড় ভুল হচ্ছে ব্যক্তিগত ও ব্যবসার টাকা এক করা। এজন্য আলাদা ব্যাংক একাউন্ট, আলাদা ক্যাশ রেজিস্টার এবং প্রতিটি লেনদেন এর ভালভাবে হিসাব রাখতে হবে।
২️. ক্যাপিটাল স্ট্রাকচার ঠিক করুন। ইক্যুইটি থেকে লোন অবশ্যই কম থাকতে হবে। নিরাপদ স্ট্রাকচার হচ্ছে ৫০%-৬০% নিজের মূলধন, ২০%-৩০% পার্টনার, ১০-২০% ব্যাংক লোন।
৩. Cash Flow Management খুবই গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। ক্যাশফ্লো ঠিক রাখার জন্য:
- বুকিং মানি রাখুন
- কিস্তি প্ল্যান ডিজাইন করুন
- আগাম খরচ–আয়ের হিসাব করুন
উদাহরণ
ফ্ল্যাট মূল্য ৪০ লাখ
- বুকিং: ৫ লাখ
- নির্মাণকালীন কিস্তি
- হস্তান্তরের আগে ১০–১৫%
এতে কাজ চলার সময় টাকার অভাবে কাজ বন্ধ হয় না।
৪. প্রজেক্ট ভিত্তিক বাজেট করুন। প্রতিটি প্রজেক্ট এর একটি আলাদা হিসাব থাকা উচিত। বাজেট এর মধ্যে রয়েছে :
জমি
নির্মাণ
অনুমোদন
মার্কেটিং
কন্টিনজেন্সি (৫–১০%)
কন্টিনজেন্সি না রাখলে ঝামেলা হতে পারে।
৫. খরচ নিয়ন্ত্রণ করতে হবে। খরচ বাড়ার কতগুলো কারণের অন্যতম হচ্ছে সঠিক সময়ে কাজ শেষ করতে না পারার কারণে দাম বেড়ে যাওয়া। এছাড়া অপ্রয়োজনীয় অফিস খরচও কমাতে হবে।
খরচ নিয়ন্ত্রণের জন্য যা করবেন:
- কোটেশন এ উল্লেখিত কাচামালের দামের তুলনা করুন,
- স্টেজ ওয়াইজ পেমেন্ট দিন,
- মাসিক খরচ রিভিউ করুন।
৬. ট্যাক্স এড়িয়ে নয় ম্যানেজ করে চলুন। বিভিন্নভাবে বৈধ উপায়ে ট্যাক্স কমানো যায়। সেসব পদ্ধতি প্রয়োগ করুন। নিয়মিত ট্যাক্স ভ্যাট দিন যাতে ভবিষ্যতে কোন সমস্যায় না পড়েন।
৬. নিয়মিত Financial Review করুন। মাসে একবার বসুন।
রিভিউ করবেন:
- মোট ইনভেস্টমেন্ট
- খরচ বনাম বাজেট
- ক্যাশ হাতে কত
- সেল স্ট্যাটাস
৭. পার্টনারশিপ ফাইন্যান্স ম্যানেজমেন্ট করার জন্য লিখিত চুক্তি থাকতে হবে যেখানে লাভ-লোকসান বন্টনের অনুপাত, টাকা তোলার নিয়ম ইত্যাদি উল্লেখ থাকবে।
৮. ব্যবসা ঝুঁকিমুক্ত ও টেকসই করার জন্য অবশ্যই Emergency & Risk Fund রাখুন যাতে অনাকাঙ্ক্ষিত পরিস্থিতিতে টিকে থাকা যায়। কমপক্ষে ৬ মাসের খরচ রিজার্ভ রাখুন।
৯. সকল হিসাব সঠিকভাবে রাখার জন্য একাউন্টটিং রিলেটেড সফটওয়্যার ব্যবহার করুন।
সবশেষে এই ফর্মুলা মনে রাখুন
- Cash Flow আগে, Profit পরে
- লোন কম, কন্ট্রোল বেশি
- প্রতিটি প্রজেক্টের আলাদা হিসাব
- খরচ লিখিত থাকতে হবে ও ট্র্যাকিং করতে হবে,
- নিয়মিত রিভিউ
উপসংহার
রিয়েল এস্টেট ব্যবসা ধৈর্য, পরিকল্পনা ও আইনি জ্ঞানের উপর নির্ভরশীল। সঠিক লোকেশন, সঠিক কাগজপত্র, সঠিক ব্যবস্থাপনা ও আধুনিক মার্কেটিং ব্যবহার করতে পারলে এটি হতে পারে আজীবন লাভজনক ও সম্মানজনক একটি ব্যবসা।