Home Business Guidelines বেকারি ব্যবসা শুরু করার গাইডলাইন। খরচ লাভসহ বিস্তারিত।

বেকারি ব্যবসা শুরু করার গাইডলাইন। খরচ লাভসহ বিস্তারিত।

বেকারি ব্যবসা

বাংলাদেশে সম্ভাবনাময় ব্যবসাগুলোর মধ্যে বেকারি ব্যবসা অন্যত্য। ধনী থেকে নিম্নবিত্ত সকল শ্রেণির মানুষ প্রতিদিন সকাল বা বিকালের নাস্তা হিসেবে পাউরুটি, কেক, বিস্কুট ও পেস্ট্রির মত বেকারি আইটেম খাচ্ছে।

তাহলে বুঝতেই পারছেন প্রায় ২০ কোটি মানুষের দেশে বেকারি আইটেম এর চাহিদা কি পরিমাণ। এই কারণে আমাদের দেশে বেকারি ব্যবসার দিন দিন প্রসার ঘটছে।

বেকারি ব্যবসা কী?

বেকারি ব্যবসা হলো এমন একটি খাদ্যভিত্তিক ব্যবসা যেখানে ব্রেড, কেক, পেস্ট্রি, বিস্কুট, বান, কাপকেক, ডোনাট ইত্যাদি তৈরি ও বিক্রি করা হয়।

বেকারি ব্যবসার ধরণ

বিভিন্ন ধরণের বেকারি ব্যবসা রয়েছে। যেমন:

১. হোম বেকারি (Home Bakery): এই ধরণের বেকারি ব্যবসায় ঘরে বসেই অর্ডার নিয়ে কাজ করে। অর্থাৎ ঘরেই উৎপাদন এবং ঘর থেকেই বিক্রি করা।

২. রিটেইল বেকারি শপ: এই ধরণের বেকারি হচ্ছে প্রচলিত বেকারি ব্যবসা। দোকান ভাড়া নিয়ে সরাসরি ক্রেতাদের কাছে বিক্রি করা হয়

৩. কাস্টম কেক ও অনলাইন বেকারি: জন্মদিন, বিয়ে, কর্পোরেট অর্ডার নিয়ে কেক সরবরাহ করা হয়। এছাড়া অনলাইনে বিক্রেতা হিসেবে সরব উপস্থিতি থস্কে৷

৪. হোলসেল বেকারি: দোকান/হোটেলে বেশি পরিমাণে বেকারি আইটেম সাপ্লাই দেওয়া।

নতুনদের জন্য হোম বেকারি বা ছোট শপ দিয়ে শুরু করাই ভালো।

বেকারি ব্যবসা শুরু করার ধাপসমূহ

ধাপ ১: মার্কেট রিসার্চ করুন

বেকারি ব্যবসায় নামার আগে আপনাকে স্থানীয় বাজার নিয়ে রিসার্চ করতে হবে।  আপনার এলাকায় কোন পণ্য বেশি বিক্রি হয় সেটা আপনাকে বের করতে হবে। এজন্য বিভিন্ন বেকারিতে যেতে পারেন। তাদের সাথে কথা বলে জানার চেষ্টা করুন।

তারা কোন বেকারি আইটেম এর কি পরিমাণ দাম রাখছে তা জানার চেষ্টা করুন।  গ্রাহকরা কোন ধরণের বেকারি আইটেম বেশি পছন্দ করে সেটি নোট করে রাখুন।

ধাপ ২: বিজনেস প্ল্যান তৈরি করুন

বেকারি ব্যবসা শুরু করার আগে একটি বিজনেস প্ল্যান তৈরি করে ফেলুন। এই প্ল্যানের মধ্যে থাকবে:

* কী কী পণ্য বিক্রি করবেন তা ঠিক করা,
* দৈনিক/মাসিক টার্গেট সেল,
* খরচ ও লাভের সম্ভাব্য হিসাব,
* মার্কেটিং কৌশল

যেকোনো ব্যবসায় সফলতার জন্য সঠিকভাবে বিজনেস প্ল্যান করা খুবই গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। আপনার প্ল্যান যত নিখুঁত হবে আপনার ব্যবসায় সফলতা তত বেশি হবে।

ধাপ ৩: স্থান নির্বাচন

সঠিক স্থান নির্বাচন ব্যবসার জন্য খুবই গুরুত্বপূর্ণ। কারণ সঠিক যায়গায় যদি আপনি আপনার দোকানটি দিতে না পারেন তাহলে আপনি নিয়মিত গ্রাহক পাবেন না। অনেক সময় দেখা যায় পণ্যের কোয়ালিটি অন্যদের তুলনায় কম থাকলেও শুধু লোকেশনের কারণে প্রচুর গ্রাহক পাওয়া যায়।

জনবহুল এলাকা, মার্কেটিং বা আবাসিক এলাকায় এই ধরণের ব্যবসা ভাল চলে। তাই স্থান নির্বাচনের ক্ষেত্রে এসব যায়গা নির্বাচন করতে পারেন।

ধাপ ৪: প্রয়োজনীয় লাইসেন্স ও অনুমতি

বাংলাদেশে বেকারি ব্যবসার জন্য সাধারণত যেসব ডকুমেন্টস লাগে তার মধ্যে রয়েছে :

  • ট্রেড লাইসেন্স (সিটি কর্পোরেশন/ইউনিয়ন)
  • ফুড লাইসেন্স / BSTI রেজিস্ট্রেশন
  • ফায়ার সেফটি (দোকান হলে)
  • টিআইএন (ভবিষ্যতের জন্য ভালো)

আরও পড়ুন : ট্রেড লাইসেন্স অনলাইন আবেদন এবং সরাসরি সংগ্রহ করার নিয়ম

ধাপ ৫. বেকারি ব্যবসার জন্য প্রয়োজনীয় মেশিনারিজ সংগ্রহ

ব্যবসা শুরু করার জন্য প্রয়োজনীয় ডকুমেন্টস সংগ্রহ করা হয়ে গেলে বেকারি আইটেম তৈরি করতে যেসব মেশিনারিজ লাগে সেগুলো সংগ্রহ করতে হবে।

নিচে এসব মেশিনারিজ এর নাম ও সম্ভাব্য দামের একটি তালিকা দেওয়া হলো:

যন্ত্রপাতি/অন্যান্য 

আনুমানিক দাম ()

ওভেন (Electric/Gas)

৩০,০০০ – ১,৫০,০০০

মিক্সার মেশিন

১৫,০০০ – ৬০,০০০

ফ্রিজ

৩০,০০০ – ৫০,০০০

কেক মোল্ড ও ট্রে

৫,০০০ – ১০,০০০

ওজন মাপার মেশিন

২,০০০ – ৫,০০০

ডো প্রুফার (Dough Proofer)

৩০,০০০ – ৮০,০০০

ওয়ার্ক টেবিল ও স্টেইনলেস স্টীল কাউন্টার

১০,০০০ – ৪০,০০০

ডিসপ্লে ক্যাবিনেট / শোকেস

২০,০০০ – ৬০,০০০

অটোমেটিক/ম্যানুয়াল কুকিজ/ডোনাট মেকার

১৫,০০০ – ৪০,০০০

ওজন স্কেল

২,০০০ – ৫,০০০

সিলিং মেশিন / প্যাকেজিং মেশিন

১০,০০০ – ৩০,০০০

ধাপ ৬. বেকারি আইটেম তৈরির জন্য কাঁচামাল সংগ্রহ

বিভিন্ন ধরণের বেকারি আইটেম তৈরি করার জন্য বিভিন্ন ধরণের কাঁচামাল লাগবে। এসব কাঁচামালের মধ্যে রয়েছে :

  • ময়দা
  • চিনি
  • ডিম
  • বাটার/মার্জারিন
  • বেকিং পাউডার/সোডা
  • দুধ
  • চকলেট, ভ্যানিলা এসেন্স
  • ফুড কালার ও ফ্লেভার

কাঁচামাল সংগ্রহ হয়ে গেলেই আপনি উৎপাদন শুরু করে দিতে পারেন। তবে বেকারি আইটেম তৈরি করতে আপনার কিছু দক্ষ লোক লাগবে। দক্ষ লোক নিলেই হবে না আপনার নিজেকেও এই বিষয়ে দক্ষ হতে হবে নাহলে ব্যবসায় সফল হতে পারবেন না।

বেকারি ব্যবসা শুরু করতে কেমন খরচ?

একটি বেকারি দোকান দিতে কেমন খরচ হবে তা নির্ভর করবে আপনার দোকানের পরিধি, যন্ত্রপাতির পরিমাণ ও কি পরিমাণ বেকারি আইটেম তৈরি করবেন তার উপর নির্ভর করবে।

একটি হোম বেকারি ব্যবসা শুরু করতে ৫০,০০০ – ১,৫০,০০০ টাকা এবং  ছোট বেকারি দোকান দিতে ২ – ৫ লক্ষ টাকা খরচ হতে পারে।

আরও পড়ুন: ৭ টি ইউনিক বিজনেস আইডিয়া- ২০২৬ সালে আপনাকে অন্যদের চেয়ে এগিয়ে রাখবে

বেকার আইটেম এর তালিকা

বেকারি ব্যবসা শুরু করতে হলে অবশ্যই আপনাকে বেকারি আইটেম সম্পর্কে জানতে হবে। নিচে বিভিন্ন ধরণের বেকারি পণ্যের একটি তালিকা দেওয়া হলো:

১. ব্রেড (Bread Items)

  • সাদা ব্রেড (White Bread)
  • ব্রাউন ব্রেড
  • হোল হুইট ব্রেড
  • মিল্ক ব্রেড
  • বান ব্রেড
  • স্যান্ডউইচ ব্রেড
  • গার্লিক ব্রেড
  • পাউরুটি
  • ফ্রেঞ্চ ব্রেড
  • ডিনার রোল

২. কেক (Cake Items)

  • ভ্যানিলা কেক
  • চকলেট কেক
  • ব্ল্যাক ফরেস্ট কেক
  • হোয়াইট ফরেস্ট কেক
  • রেড ভেলভেট কেক
  • ফ্রুট কেক
  • বাটার কেক
  • স্পঞ্জ কেক
  • কাস্টমাইজড কেক (নাম/ডিজাইনসহ)
  • বিয়ের কেক (Wedding Cake)

৩. কাপকেক ও মাফিন

  • ভ্যানিলা কাপকেক
  • চকলেট কাপকেক
  • রেড ভেলভেট কাপকেক
  • ব্লুবেরি মাফিন
  • চকলেট চিপ মাফিন
  • কলা মাফিন
  • ব্রান মাফিন

৪. বিস্কুট ও কুকিজ

  • বাটার বিস্কুট
  • চকলেট কুকিজ
  • চকলেট চিপ কুকিজ
  • ওটস কুকিজ
  • ড্রাই ফ্রুট কুকিজ
  • জিঞ্জার বিস্কুট
  • নারকেল বিস্কুট
  • শর্টব্রেড কুকিজ

৫. পেস্ট্রি আইটেম

  • চকলেট পেস্ট্রি
  • ভ্যানিলা পেস্ট্রি
  • স্ট্রবেরি পেস্ট্রি
  • কফি পেস্ট্রি
  • ফ্রুট পেস্ট্রি
  • ব্ল্যাক ফরেস্ট পেস্ট্রি

৬. স্ন্যাকস ও সেভরি আইটেম

  • সসেজ রোল
  • চিকেন প্যাটিস
  • ভেজিটেবল প্যাটিস
  • চিকেন পাফ
  • বিফ পাফ
  • পিজ্জা পাফ
  • চিকেন বান
  • সিঙ্গারা (বেকড)
  • কুইচ (Quiche)

৭. ডোনাট ও সুইট বেকারি

  • চকলেট ডোনাট
  • সুগার ডোনাট
  • গ্লেজড ডোনাট
  • জ্যাম ফিল্ড ডোনাট
  • ক্রিম ডোনাট
  • সিনামন রোল

৮. পায় ও টার্ট

  • অ্যাপল পায়
  • চিকেন পায়
  • মিট পায়
  • লেমন টার্ট
  • চকলেট টার্ট
  • ফ্রুট টার্ট

৯. পিজ্জা ও ফাস্ট ফুড বেকারি

  • মিনি পিজ্জা
  • ব্রেড পিজ্জা
  • ফোকাচ্চা ব্রেড
  • চিজ ব্রেড

১০. স্পেশাল ও উৎসবের আইটেম

  • ঈদের সেমাই কেক
  • বড়দিনের ফ্রুট কেক
  • ভ্যালেন্টাইন স্পেশাল কেক
  • কর্পোরেট কেক
  • থিম কেক

১১. প্যাকেজড বেকারি আইটেম

  • প্যাকেট বিস্কুট
  • প্যাকেট কেক স্লাইস
  • প্যাকেট বান
  • রেডি ব্রেড

নতুনদের জন্য সবচেয়ে লাভজনক আইটেম:

  • কাপকেক
  • পেস্ট্রি
  • কুকিজ
  • কাস্টম কেক
  • চিকেন প্যাটিস / পাফ

বেকারি ব্যবসায় গড় লাভের হার

বেকারি ব্যবসায় সাধারণত

গ্রস প্রফিট মার্জিন: ৩০% – ৬০%
নেট প্রফিট মার্জিন: ২০% – ৩৫%

আইটেমভিত্তিক লাভের উদাহরণ

কেক (১ পাউন্ড)

তৈরি খরচ: ৩৫০ – ৫০০ টাকা
বিক্রয় মূল্য: ৮০০ – ১,২০০ টাকা
লাভ: ৩০০ – ৬০০ টাকা

কাপকেক (প্রতি পিস)

খরচ: ২৫ – ৪০ টাকা
বিক্রি: ৭০ – ১০০ টাকা
লাভ: ৩০ – ৬০ টাকা

কুকিজ (১০০ গ্রাম)

খরচ: ৫০ – ৭০ টাকা
বিক্রি: ১২০ – ১৮০ টাকা
লাভ: ৬০ – ১১০ টাকা

চিকেন প্যাটিস

খরচ: ৩৫ – ৫০ টাকা
বিক্রি: ৯০ – ১২০ টাকা
লাভ: ৪০ – ৭০ টাকা

মাসিক লাভের বাস্তব হিসাব (ছোট বেকারি শপ)

ধরা যাক,

  • দৈনিক বিক্রি: ৮,০০০ টাকা
  • মাসিক বিক্রি: ২,৪০,০০০ টাকা

খরচ

  • কাঁচামাল: ১,৪০,০০০
  • দোকান ভাড়া + বিদ্যুৎ: ২৫,০০০
  • কর্মচারী: ২০,০০০
  • অন্যান্য: ১০,০০০

মোট খরচ: ১,৯৫,০০০ টাকা

মাসিক নীট লাভ: ৪৫,০০০ টাকা

লাইভ বেকারি কি?

আমরা সবাই জানি যে, লাইভ কথার মানে হচ্ছে সরাসরি। লাইভ বেকারি হচ্ছে গ্রাহকের সামনে সরাসরি বেকার আইটেম তৈরি করা এবং তাজা অবস্থায় বিক্রি করা। বর্তমানে এই লাইভ বেকারি আইডিয়া বাংলাদেশে বেশ জনপ্রিয়তা পেয়েছে৷

লাইভ বেকারি ব্যবসা কিভাবে শুরু করবেন?

কিভাবে লাইভ বেকারি ব্যবসা শুরু করবেন সেই পদ্ধতি ইতিমধ্যে বেকারি ব্যবসা শুরু করার ধাপেই আলোচনা করেছি তাই নতুন করে বলার কিছু নেই। উপরের ধাপগুলি অনুসরণ করেই আপনি লাইভ বেকারি ব্যবসা শুরু করতে পারেন।

বেকারি/লাইভ বেকারি ব্যবসায় সফল হওয়ার টিপস

  • স্বাদ ও কোয়ালিটিতে কোনো আপস করবেন না। এজন্য দক্ষ কারিগর নিয়োগ দিন। স্বাদ ভাল হলে এবং কোয়ালিটি ঠিক রাখতে পারলে নিয়মিত ক্রেতা পাবেন।
  • পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা বজায় রাখুন। বেশিরভাগ ক্রেতাই দোকান অপরিষ্কার দেখলে কিছু কিনতে চায় না।
  • কাস্টমারের ফিডব্যাক নিন। তাদের ফিডব্যাক ভাল করে মূল্যায়ন করুন। তাদের পরামর্শ অনুযায়ী খাবারের মান উন্নয়ন করুন।
  • খাবারে নতুন ডিজাইন ও ফ্লেভার আনুন। এতে খাবারে বৈচিত্র্যতা বাড়ে এবং ক্রেতাদের আকর্ষণ করে।
  • নিয়মিত সোশ্যাল মিডিয়ায় পোস্ট দিন। এর ফলে মানুষ সহজেই আপনার বেকারি ব্যবসা সম্পর্কে জানতে পারবে এবং ক্রেতার সংখ্যা বাড়বে। মাঝে মাঝে ফেসবুকে বিজ্ঞাপন দিন।
  • বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের সাথে যোগাযোগ রক্ষা করার চেষ্টা করুন এর ফলে তাদের কাছ থেকে বড় অর্ডার পাওয়ার সম্ভাবনা বেড়ে যাবে।

উপসংহার

আশা করি উপরের গাইডলাইন থেকে কিভাবে একটি  বেকারি ব্যবসা শুরু করবেন এই বিষয়ে ভাল একটা ধারণা পেলেন।  এই গাইডলাইন অনুসরণ করে আপনি সহজেই এই ধরণের ব্যবসা শুরু করতে পারবেন।

NO COMMENTS

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

Exit mobile version