Home Business Guidelines রেস্টুরেন্ট ব্যবসা শুরু করার জন্য যেভাবে পরিকল্পনা করলে সফল হবেন

রেস্টুরেন্ট ব্যবসা শুরু করার জন্য যেভাবে পরিকল্পনা করলে সফল হবেন

রেস্টুরেন্ট ব্যবসা শুরু করতে যাচ্ছেন? কিন্তু কিভাবে রেস্টুরেন্ট ব্যবসার পরিকল্পনা করতে হয় জানেন না?

আমাদের দেশে অনেক উদ্যোক্তা আছেন যারা ভালভাবে না জেনে রেস্টুরেন্ট ব্যবসা দিয়ে ক্ষতির সম্মুখীন হচ্ছেন।

এই ধরণের ব্যবসায় টিকে থাকতে হলে কিভাবে পরিকল্পনা করতে হবে, কোন ধরণের কৌশল প্রয়োগ করতে হবে সেসব বিষয়ে ভালভাবে ধারণা নিয়ে শুরু করলে আপনি সফল হবেন।

রেস্টুরেন্ট ব্যবসা পরিকল্পনা যেভাবে করবেন

আপনি যদি রেস্টুরেন্ট ব্যবসা শুরু করতে চান তাহলে আপনাকে রেস্টুরেন্ট ব্যবসা পরিকল্পনা সঠিকভাবে করতে হবে।

কিভাবে রেস্টুরেন্ট ব্যবসা পরিকল্পনা করবেন তা নিচে আলোচনা করা হলো:

১. রেস্টুরেন্টের ধরণ ঠিক করুন

রেস্টুরেন্ট ব্যবসা শুরু করার আগে প্রথমেই আপনাকে এও ব্যবসার ধরণ ঠিক করতে হবে। কারণ ধরণ ঠিক করতে না পারলে আপনি এই ব্যবসায় নামতে পারবেন না।

রেস্টুরেন্টের ধরণ নিম্নরুপ:

  • লোকাল খাবারের রেস্টুরেন্ট
  • ফাস্ট ফুড
  • ফ্যামিলি রেস্টুরেন্ট
  • ক্যাফে / কফি শপ
  • থিম রেস্টুরেন্ট (BBQ, Chinese, Thai ইত্যাদি।

২. টার্গেট কাস্টমার নির্ধারণ করুন ও বিশ্লেষণ

রেস্টুরেন্ট ব্যবসা শুরু করতে হলে আপনাকে টার্গেট কাস্টমার ঠিক করতে হবে। কারণ টার্গেট কাস্টমারের উপর নির্ভর করবে আপনার খাবারের দাম, মেনু ও ডেকোরেশন।

আপনার টার্গেট কাস্টমার হতে পারে ছাত্র, অফিসগামী মানুষ, পরিবার, মধ্যবিত্ত / উচ্চবিত্ত।

এখানে দেখবেন একেকজনের আয় ও চাহিদা একেকরকম। তাই সবাইকে আপনি সন্তুষ্ট করার মত রেস্টুরেন্ট দিতে পারবেন না। তাই কাস্টমার নির্দিষ্ট করে সেভাবে সার্ভিস দিতে পারলে ভাল সাফল্য পাওয়া যায়।

তবে টার্গেট কাস্টমার ঠিক করার আগে আপনার এলাকার মানুষ কী খেতে পছন্দ করে এবং তারা কোন ধরণের রেস্টুরেন্টে খেতে যায়, তাদের আয় কেমন এসব বিষয় বিশ্লেষণ করুন।

৩. লোকেশন নির্বাচন

রেস্টুরেন্ট ব্যবসায় সঠিক লোকেশন নির্বাচন খুব গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। এমন স্থান নির্বাচন করুন যেখানে আপনি নিয়মিত কাস্টমার পাবেন। নিয়মিত কাস্টমার পাওয়া মানে নিয়মিত আয়।

লোকেশন হতে পারে ব্যস্ত এলাকা, অফিস / কলেজ / মার্কেটের কাছে। রেস্টুরেন্টে পার্কিং সুবিধা থাকলে ভালো।

৪. বাজেট ও খরচের পরিকল্পনা

রেস্টুরেন্ট ব্যবসা শুরু করার আগে বাজেট ও খরচের পরিকল্পনা ভালভাবে করতে হবে। ব্যবসা দিতে প্রাথমিক যে বাজেট লাগবে সে বিষয়ে আপনার ধারণা থাকতে হবে।

একটি রেস্টুরেন্টের প্রাথমিক খরচের খাতগুলো হচ্ছে:

  • দোকান ভাড়া অগ্রিম
  • ইন্টেরিয়র ও ডেকোরেশন
  • রান্নার যন্ত্রপাতি (চুলা, ফ্রিজ, ওভেন)
  • টেবিল–চেয়ার
  • লাইসেন্স ও ট্রেড লাইসেন্স

এছাড়া মাসিক খরচের মধ্যে রয়েছে:

  • কর্মচারীর বেতন
  • গ্যাস, বিদ্যুৎ, পানি
  • কাঁচামাল
  • মার্কেটিং

৫. মেনু পরিকল্পনা

প্রথমদিকে অল্প আইটেম দিয়ে শুরু করতে পারেন। জনপ্রিয় ও লাভজনক আইটেম রাখুন। যেসব আইটেমে মার্জিন বেশি, সেগুলো হাইলাইট করুন।

মেনু বানানোর গোল্ডেন রুল হচ্ছে ১৫–২০টি আইটেম রাখুন, এর মধ্যে ৬০–৭০% আইটেম এমন থাকবে যেন দ্রুত রান্না করা যায়। একই কাঁচামাল দিয়ে একাধিক আইটেম বানাবেন। দাম যেন পাশের রেস্টুরেন্টের সমান বা সামান্য কম হয়।

আপনার টার্গেট কাস্টমার, এলাকার মানুষের আয় ও ভাড়ার উপর নির্ভর করবে আপনার মেনু কেমন হবে ও দাম কেমন রাখবেন।

নিচে কিছু আইটেমের নাম ও সম্ভাব্য দাম দিলাম।

রাইস আইটেম

আইটেম দাম 
চিকেন বিরিয়ানি ১৮০ – ২২০
বিফ বিরিয়ানি ২৬০ – ৩২০
চিকেন ফ্রাইড রাইস ২০০ – ২৪০
ভেজিটেবল ফ্রাইড রাইস ১৬০ – ১৮০
প্লেইন রাইস ৪০ – ৬০

চিকেন আইটেম

আইটেম দাম 
চিকেন কারি ১৬০ – ২০০
চিকেন রোস্ট ২২০ – ২৬০
চিকেন ফ্রাই (২ পিস) ১৮০ – ২২০
চিকেন গ্রিল ২৪০ – ২৮০

বিফ আইটেম

আইটেম দাম
বিফ কারি ২৪০ – ৩০০
বিফ ভুনা ৩০০ – ৩৮০
বিফ কাবাব ২৮০ – ৩৪০

ফাস্টফুড আইটেম

আইটেম দাম
চিকেন বার্গার ১৫০ – ১৮০
বিফ বার্গার ২০০ – ২৪০
চিকেন শাওয়ারমা ১৮০ – ২২০
ফ্রেঞ্চ ফ্রাই ১০০ – ১৪০

স্ন্যাকস

আইটেম দাম
চিকেন সিঙ্গারা ৪০ – ৫০
চিকেন প্যাটিস ৬০ – ৮০
সামুচা ৩০ – ৪০

পানীয়

আইটেম দাম
মিনারেল ওয়াটার ২০ – ২৫
সফট ড্রিংকস ৩০ – ৪০
লাচ্ছি ৮০ – ১২০
লেবু শরবত ৬০ – ৮০

এছাড়া বিভিন্ন ধরণের মাছের, ভর্তা ও ভাজির আইটেম রাখতে পারেন।

স্মার্ট প্রাইসিং স্ট্র্যাটেজি

কম্বো অফার

চিকেন বিরিয়ানি + ড্রিংক = ২২০ টাকা
বার্গার + ফ্রাই + ড্রিংক = ২৭০ টাকা

সাইকোলজিক্যাল প্রাইসিনহ স্ট্র‍্যাটেজি হচ্ছে ২০০ টাকা না লিখে ১৯৯ টাকা লিখুন। গ্রাহক আকর্ষণ করার জন্য কিছু আইটেমে স্টার চিহ্ন দিয়ে স্পেশাল শব্দ ব্যবহার করুন। এতে বিক্রয় বাড়বে।

যেসব ভুল করবেন না

  • খুব বেশি আইটেম রাখা ঠিক না,
  • কাঁচামালের দাম না মিলিয়ে দাম নির্ধারণ করবেন না,
    পাশের দোকানের থেকে অনেক বেশি দাম রাখবেন না,
  • সব আইটেমে সমান লাভ ধরা ঠিক না,

আরও পড়ুন: ঘরে বসে ব্যবসা করার ৭ টি লাভজনক আইডিয়া

৬. রেস্টুরেন্ট ব্যবসা শুরু করার জন্য ডকুমেন্টেশান 

বাংলাদেশ হোটেল ও রেস্তোরাঁ আইন অনুযায়ী, রেস্তোরাঁ ব্যবসা করতে হলে একজন উদ্যোক্তাকে সরকারের ৭ টি সংস্থার অনুমোদন ও ছাড়পত্র নিতে হয়।

রেস্টুরেন্ট রেজিষ্ট্রেশনের জন্য জেলা প্রশাসকের (ডিসি) কার্যালয়ে আবেদন করতে হবে। তবে অনলাইনেও আবেদন করা যায়। আবেদনের জন্য নিচের ডকুমেন্টগুলো লাগবে:

(১) জমির মালিকানার মূল দলিল, নামজারী, বাড়ী ভাড়া বা ইজারা চুক্তির সত্যায়িত কপি
(২) ভবন নির্মানের অনুমোদন ও শর্তপূরণ সংক্রান্ত দলিলাদির সত্যায়িত কপি
(৩) ডিটেইল স্ট্রাকচারাল প্লান, নকসা ও সুবিধাদির বিবরণ সংক্রান্ত দলিলাদির সত্যায়িত কপি
(৪) ব্যবসা পরিচালনা সংশ্লিষ্ট অনুমতিপত্র, ট্রেড লাইসেন্স বা সনদের সত্যায়িত কপি;
(৫) বিগত অর্থ-বৎসরে পরিশোধিত আয়কর প্রদানের প্রমানকের সত্যায়িত ফটোকপি (প্রযোজ্য ক্ষেত্রে)
(৬) ছবি, আইডি-কার্ড এর ফটোকপিসহ সত্ত্বাধিকারী/অংশীদার/পরিচালকবৃন্দের নাম ও ঠিকানা
(৭) মেমোরান্ডাম অব আর্টিকেলস এবং মেমোরান্ডাম অব এসোসিয়েশন এর সত্যায়িত ফটোকপি (প্রযোজ্য ক্ষেত্রে)
(৮) লাইসেন্স ফি জমার এ চালান কপি
(৯) ভ্যাট জমার এ চালান কপি
(১০) উৎসে কর জমার এ চালান কপি

রেস্টুরেন্ট এর নিবন্ধন সনদ ইস্যুর তারিখ হতে ১ বছরের মধ্যে লাইসেন্স গ্রহন করতে হবে।(উল্লেখিত সময়ের মধ্যে কোন ব্যক্তি হোটেল বা রেস্তোরাঁর ব্যবসা আরম্ভ ও লাইসেন্স গ্রহণ করতে ব্যর্থ হলে স্বয়ংক্রিয়ভাবে নিবন্ধন সনদ বাতিল হবে।)

জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ের পাশাপাশি প্রয়োজনে কলকারখানা ও প্রতিষ্ঠান পরিদর্শন অধিদপ্তর, ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্স অধিদপ্তর, পরিবেশ অধিদপ্তর, সিটি করপোরেশন ও সিভিল সার্জনের কার্যালয় থেকে অনুমোদন ও লাইসেন্স নিতে হয়।

এর বাইরে দই ও বোরহানির মতো বোতল বা প্যাকেটজাত খাদ্যপণ্য কোনো রেস্তোরাঁ বিক্রি করলে বিএসটিআইয়ের (বাংলাদেশ স্ট্যান্ডার্ডস অ্যান্ড টেস্টিং ইনস্টিটিউশন) অনুমোদন নিতে হয়।

৭. কর্মচারী নিয়োগ ও ট্রেনিং

একটি রেস্টুরেন্ট চালাতে বিভিন্ন পদে লোকবল নিয়োগ দিতে হবে হবে। এসব লোকবলের মধ্যে রয়েছে:

  • কুক / শেফ
  • হেলপার
  • ওয়েটার
  • ক্যাশিয়ার

কুক/শেফ নিয়োগ দেওয়ার ক্ষেত্রে ভাল করে যাচাই করুন। কারণ রান্না ভাল না হলে আপনি কাস্টমার হারাবেন। আবার রান্না ভাল হলে প্রচুর রিটার্ন কাস্টমার পাবেন।

৮. মার্কেটিং প্ল্যান

শুধু দোকান খুললেই হবে না গ্রাহক আকর্ষণ করার জন্য মার্কেটিং করতে হবে। যত বেশি মার্কেটিং করবেন গ্রাহক তত বাড়বে।

মার্কেটিং করার জন্য ফেসবুকে একটি পেজ খুলেন। সেখানে নিয়মিত বিভিন্ন আইটেম এর ছবি শেয়ার করুন। আবার ফেসবুক এডস এর মাধ্যমে আপনি খুব সহজেই টার্গেট গ্রাহকের কাছে পৌঁছাতে পারবেন।

গুগল ম্যাপে আপনার রেস্টুরেন্টের নাম, ঠিকানা ও ছবি যুক্ত করুন। গুগল বিজনেস প্রোফাইল তৈরি করুন।

ফুডপান্ডা, পাঠাওসহ বিভিন্ন ফুড ডেলিভারি অ্যাপে যুক্ত হোন।

গ্রাহকদের কাছ থেকে পাওয়া রিভিউ সোশ্যাল মিডিয়াতে প্রচার করুন। এর ফলে গ্রাহকের আস্থা বাড়বে।

রেস্টুরেন্ট উদ্বোধন করার সময় গ্রাহক ধরার জন্য আকর্ষণীয় অফার দিন। এছাড়া মাঝে মাঝে বিভিন্ন খাবারে ডিসকাউন্ট দিন।

রেস্টুরেন্ট ব্যবসা শুরু করতে কত টাকা লাগে?

নতুন রেস্টুরেন্ট ব্যবসায়ীদের মনে এই প্রশ্নটা আসবেই যে, একটি রেস্টুরেন্ট ব্যবসা শুরু করতে কত টাকা লাগে?

এই ধরণের ব্যবসা শুরু করতে কেমন খরচ হবে তা নির্দিষ্ট করে বলা কঠিন। যায়গার ভাড়া, ডেকোরেশন, সাইজ ইত্যাদির উপর নির্ভর করে খরচের তারতম্য হবে।

নিচে ছোট, মাঝারি ও বড় রেস্টুরেন্ট দিতে কত খরচ হবে তার আনুমানিক একটা হিসাব দিলাম।

ছোট রেস্টুরেন্ট (লোকাল / ছোট ফাস্টফুড)

আয়তন: ৩০০-৫০০ স্কয়ার ফিট
বাজেট:৩ – ৫ লক্ষ টাকা

খরচের বিবরণ:

দোকান ভাড়া অগ্রিম (২–৩ মাস): ৫০,০০০ – ১,০০,০০০
সাধারণ ডেকোরেশন: ৩০,০০০ – ৬০,০০০
রান্নার সরঞ্জাম: ১,০০,০০০ – ১,৫০,০০০
টেবিল–চেয়ার: ৩০,০০০ – ৫০,০০০
লাইসেন্স ও কাগজপত্র: ১০,০০০ – ২০,০০০
প্রাথমিক কাঁচামাল: ২০,০০০ – ৩০,০০০

মাঝারি রেস্টুরেন্ট (ফ্যামিলি / ক্যাজুয়াল ডাইনিং)

আয়তন: ৬০০– ১,০০০ স্কয়ার ফিট
বাজেট: ৬ – ১২ লক্ষ টাকা

খরচের বিবরণ:

ভাড়া অগ্রিম: ১ – ২ লক্ষ
ইন্টেরিয়র ও ডেকোরেশন: ১.৫ – ৩ লক্ষ
রান্নার যন্ত্রপাতি: ২ – ৩ লক্ষ
টেবিল–চেয়ার: ১ – ১.৫ লক্ষ
লাইসেন্স ও ফায়ার সেফটি: ৩০,০০০ – ৫০,০০০
সফটওয়্যার / POS: ২০,০০০ – ৪০,০০০
কাঁচামাল ও উদ্বোধনী খরচ: ৫০,০০০ – ১ লক্ষ

বড় রেস্টুরেন্ট (ব্র্যান্ডেড / থিম রেস্টুরেন্ট)

আয়তন: ১৫০০+ স্কয়ার ফিট
বাজেট: ১৫ – ৩০+ লক্ষ টাকা

খরচের বিবরণ:

প্রিমিয়াম লোকেশন ভাড়া: ৩ – ৬ লক্ষ
ইন্টেরিয়র ও ব্র্যান্ডিং: ৫ – ১০ লক্ষ
হাই-এন্ড কিচেন ইকুইপমেন্ট: ৫ – ৮ লক্ষ
ফার্নিচার ও লাইটিং: ২ – ৪ লক্ষ
লাইসেন্স ও অনুমোদন: ৫০,০০০ – ১ লক্ষ
মার্কেটিং ও উদ্বোধন: ১ – ২ লক্ষ

মাসিক চলতি খরচ

কর্মচারী বেতন: ৪০,০০০ – ২ লক্ষ
ভাড়া: ১৫,০০০ – ১ লক্ষ+
গ্যাস, বিদ্যুৎ, পানি: ১০,০০০ – ৪০,০০০
কাঁচামাল: বিক্রয়ের ৩০–৪০%
মার্কেটিং ও অন্যান্য: ৫,০০০ – ২০,০০০

রেস্টুরেন্ট ব্যবসায় লাভ কেমন?

রেস্টুরেন্ট ব্যবসায় গড়ে ১৫-২০% লাভ হয়ে থাকে। তাই যত বেশি বিক্রয় করতে পারবেন লাভের পরিমাণ তত বাড়বে।

তবে কর্মচারীদের অনৈতিক কার্যক্রম, অতিরিক্ত দামে খাবার উপাদান কেনা, অতিরিক্ত পরিচালনা খরচ লাভের পরিমাণ কমে যেতে পারে।

আরও পড়ুন: মুদি দোকান ব্যবসা শুরু করতে কত টাকা লাগে? বিক্রয় বাড়ানোর কৌশল।

রেস্টুরেন্ট ব্যবসায় সফল হওয়ার ১০টি বাস্তব কৌশল

রেস্টুরেন্ট ব্যবসায় সফল হওয়ার জন্য নিচের টিপসগুলো অনুসরণ করতে পারেন:

১. খাবারের মানে কখনো কম্প্রোমাইজ করবেন না

ডেকোরেশন মানুষ টানে, কিন্তু খাবারের মান গ্রাহক ফিরিয়ে আনে। স্বাদ ঠিক রাখতে হবে ও প্রতিনিয়ত উন্নতি করার চেষ্টা করতে হবে।

২. অতিরিক্ত আইটেম না রাখা

প্রথমদিকে অনেক বেশি আইটেমে ফোকাস না করে অল্প আইটেম দিয়ে শুরু করা উচিৎ। যেসব আইটেম বেশি বিক্রি হয়, দ্রুত বানানো যায় ও লাভ বেশি সেগুলোকে গুরুত্ব দিন বেশি।

একটা স্পেশাল আইটেম তৈরি করুন যেটি গ্রাহকদের মনযোগ আকর্ষণ করতে সক্ষম হয়।

৩. লোকেশন ও ভাড়ার ভারসাম্য

লোকেশন ও ভাড়ার মধ্যে সামঞ্জস্য থাকতে হবে। যেসব লোকেশনে জনসাধারণ বেশি সেখানে গ্রাহকের পরিমাণ বেশি হয়। আবার অনেক স্থান আছে যেখানে মানুষের আনাগোনা তুলনামূলক কম।

জনবহুল লোকেশনে ভাড়া বেশি হলে ঠিক আছে কিন্তু কম জনবহুল এলাকায় ভাড়া বেশি হওয়া যাবে না। ভাড়া যেন সম্ভাব্য বিক্রয়ের ২০–২৫% এর বেশি না হয়।

৪. কাস্টমার সার্ভিস উন্নত করুন

ভাল কাস্টমার সার্ভিস ফ্রি মার্কেটিং এর কাজ করে। গ্রাহকদের সাথে হাসিমুখে কথা বলা, অর্ডার দেরি হলে জানানো, সমস্যা হলে তর্ক না করে সমাধান করা হচ্ছে উত্তম কাস্টমার সার্ভিসের উদাহরণ।

৫. সঠিকভাবে হিসাব রাখা

এই জায়গায় বেশিরভাগ রেস্টুরেন্ট মালিক ফেল করে। সঠিকভাবে হিসাব রাখতে হবে ও হিসাবের কাজটি কর্মচারীদের উপর না দিয়ে নিজে রাখার চেষ্টা করবেন।

প্রতিদিন বিক্রয় লিখুন, কাঁচামাল স্টক চেক করুন, লাভ আলাদা করে রাখুন।

৬. কর্মচারী বাছাই ও কন্ট্রোল

একজন দক্ষ ও ভাল শেফ প্রচুর সন্তুষ্ট গ্রাহক তৈরি করবে যারা আপনার রেস্টুরেন্টে খাওয়ার জন্য বার বার ফিরে আসবে।

ওয়েটারদের সুন্দর ব্যবহার ও দ্রুত সার্ভিস খাবারে অসন্তুষ্ট গ্রাহককেও সন্তুষ্ট করবে।

সৎ ও নীতিবান স্টাফ লাভ বৃদ্ধিতে অনেক ভূমিকা পালন করে। তাই এসব বিবেচনা করে সঠিক লোকবল নিয়োগ দিতে হবে। তাদেরকে উৎসাহিত করতে মাঝে মাঝে বোনাস দিন।

৭. অনলাইনে সক্রিয় হোন

বিজনেস ডিরেক্টরি, গুগল বিজনেস, গুগল ম্যাপে নিজের রেস্টুরেন্ট যুক্ত করুন। রেস্টুরেন্টের নামে ফেসবুকে পেজ খুলে সেখানে বিভিন্ন খাবারের সুন্দর সুন্দর ছবি শেয়ার করুন ও কাস্টমারদের রিভিউ প্রচার করুন।

৮. ফুড ওয়েস্টেজ কমান

ফুড ওয়েস্টেজ আপনার খরচ বাড়াবে যা সরাসরি লাভের পরিমাণ কমিয়ে দেয়। তাই পরিমাণ পরিমাণ বুঝে রান্না করা উচিৎ। কম বিক্রি হওয়া আইটেম বাদ দিন।

৯. নিয়মিত বিশ্লেষণ করুন

প্রতি মাসে চেক করে দেখুন কোন আইটেম বেশি বিক্রি হচ্ছে?,কোন সময় বেশি কাস্টমার আসে? কোথায় খরচ বেশি হচ্ছে? এসব বিষয় বিশ্লেষণ করে উপযুক্ত ব্যবস্থা নিতে হবে।

আরও পড়ুন: বেকারি ব্যবসা শুরু করার গাইডলাইন। খরচ লাভসহ বিস্তারিত।

রেস্টুরেন্ট কিভাবে ডেকোরেশন করবেন?

রেস্টুরেন্ট ডেকোরেশন
Photo Credit: Adrien Olichon

রেস্টুরেন্ট ব্যবসা শুরু করার আগে আপনাকে ডেকোরেশন নিয়ে চিন্তা করতে হবে। কারণ সুন্দর ডেকোরেশন গ্রাহক আকর্ষণ করার অন্যতম উপায়।

কিভাবে রেস্টুরেন্ট ডেকোরেশন করবেন সে বিষয়ে নিচে আলোচনা করা হলো:

১. আগে Concept ঠিক করুন

ডেকোরেশন শুরু করার আগে কয়েকটা বিষয় বিবেচনা করুন। আপনার টার্গেট গ্রাহক কারা, খাবারের ধরণ ও বাজেট কেমন।

Concept উদাহরণ:

ফাস্টফুড: মডার্ন, কালারফুল
দেশি খাবার: উডেন, গ্রামীণ টাচ
ক্যাফে: মিনিমাল, উষ্ণ আলো
ফ্যামিলি: পরিষ্কার, আরামদায়ক

২. কালার ঠিক করুন

একটা রেস্টুরেন্টে ২-৩টা কালারই যথেষ্ট।

ভালো কালার কম্বো:

লাল + কালো (ফাস্টফুডে ক্ষুধা বাড়ায়)
বাদামি + ক্রিম (দেশি / ফ্যামিলি)
সাদা + উড কালার (ক্যাফে)
ডার্ক গ্রিন + গোল্ড (প্রিমিয়াম ফিল)

অতিরিক্ত রঙ ব্যবহার করবেন না।

৩. লাইটিং

লাইটিং আপনার রেস্টুরেন্টের সৌন্দর্যকে গ্রাহকদের সামনে ফুটিয়ে তুলে। হলুদ/ওয়ার্ম লাইট ব্যবহার করতে পারেন। খুব বেশি উজ্জ্বল যেন না হয়। টেবিলের ওপর ফোকাস লাইট ভালো কাজ করে। সাদা টিউব লাইট এড়িয়ে চলুন।

৪. বসার ব্যবস্থা

টেবিল খুব কাছাকাছি না দেওয়াই ভাল৷ পরিবার ও কাপলের জন্য আলাদা কর্নার থাকলে ভালো হয়।
দেয়ালের পাশে বেঞ্চ বসালে জায়গা বাঁচে। চেয়ার যেন আরামদায়ক হয় সেদিকে লক্ষ্য রাখবেন।

৫. দেয়াল ডেকোরেশন

বেশি খরচ না করেও সুন্দর করা যায়। এজন্য দেয়ালে যা করতে পারেন:

  • ফুড কোটেশন ফ্রেম দিতে পারেন,
  • ওয়াল স্টিকার লাগানো যেতে পারে,
  • খাবারের বড় ছবি দিতে পারেন,
  • কাঠের তাক  সাথে ছোট গাছ,
  • বাংলা প্রবাদ / দেশি আর্ট করতে পারেন,

৬. ফ্লোর ও ছাদ

ফ্লোরে সুন্দর টাইলস বা ম্যাট রঙ ব্যবহার করতে পারেন। ছাদে লুকানো LED বা কালো পেইন্ট ও লাইট বসাতে পারেন। এছাড়া ইন্টেরিয়র ডিজাইনার দিয়ে সুন্দর করে ডিজাইন করাতে পারেন।

৭. খোলা রান্নাঘর

গ্রাহকের আস্থা অর্জনের এটা একটা ভাল স্ট্র‍্যাটেজি। এর ফলে গ্রাহকরা সরাসরি আপনার রান্নাঘর দেখতে পারবেন।

তবে এক্ষেত্রে আপনার রান্নাঘর এবং সরঞ্জাম অবশ্যই পরিষ্কার পরিচ্ছন্ন হত হবে। আর পরিষ্কার পরিচ্ছন্নতা সব গ্রাহকেরই পছন্দ।

৮. ব্র্যান্ডিং

রেস্টুরেন্ট ডেকোরেশন এর সময় ব্র‍্যান্ডিং এর বিষয়টি মাথায় রাখতে হবে। রেস্টুরেন্টের নামের সুন্দর সাইনবোর্ড দিবেন, টেবিল, দেওয়াল, কাউন্টার ইত্যাদি স্থানে রেস্টুরেন্টের লোগো ব্যবহার করবেন। স্টাফদের জন্য ইউনিফর্ম নির্দিষ্ট করে দিন।

শেষ কথা

রেস্টুরেন্ট ব্যবসা হচ্ছে খাবার, ব্যবস্থাপনা ও মার্কেটিং এই তিনটার সঠিক সমন্বয়। পরিকল্পনা ঠিক থাকলে ছোট রেস্টুরেন্ট থেকেও বড় ব্র্যান্ড বানানো সম্ভব।

প্রথম দিকে লাভ কম হতে পারে কিন্তু ধৈর্য ও কাস্টমার সার্ভিস ভাল দিতে পারলে দ্রুত গ্রাহক সংখ্যা বাড়বে, এর পাশাপাশি লাভের পরিমাণও বাড়বে।

NO COMMENTS

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

Exit mobile version